পুরোনো মেসেজ এডিট করে এআই কারসাজি! কীভাবে টেলিগ্রামকে ফাঁদে ফেলল সাইবার হামলাকারীরা?

মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রাম (Telegram)-এর প্রতিষ্ঠাতা তথা প্রধান নির্বাহী পাভেল দুভেরভ (Pavel Durov) অ্যাপল-এর অ্যাপ স্টোর (App Store) থেকে তাঁদের অ্যাপের সাময়িক অপসারণের জন্য এক “টেকডাউন এক্সটরশনিস্ট” বা চাঁদাবাজ চক্রকে দায়ী করেছেন। বেশ কয়েকটি দেশের অ্যাপ স্টোর থেকে টেলিগ্রাম হঠাৎ করেই উধাও হয়ে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অবশ্য তা আবার ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

কীভাবে ঘটেছিল এই ঘটনা?
অ্যাপল সূত্রে জানানো হয়েছিল যে, এক ব্যবহারকারীর মাধ্যমে শিশু যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত অবৈধ কনটেন্ট (CSAM) ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পাওয়ার পরই এই পদক্ষেপ করা হয়েছিল। টেলিগ্রাম অবশ্য দ্রুত ওই কন্টেন্ট সরিয়ে ফেলে এবং সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টটি ব্লক করে দেয়, যার ফলে অ্যাপল পুনরায় অ্যাপটিকে স্টোরে ফিরিয়ে আনে। তবে এই সাময়িক বরখাস্তের সময়েও বিদ্যমান টেলিগ্রাম ব্যবহারকারীরা পরিষেবাটি ব্যবহার চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন।

এক্স (X)-এ দেওয়া একটি পোস্টে দুভেরভ দাবি করেছেন যে, হামলাকারী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বা এআই-এর মাধ্যমে পরিবর্তিত অবৈধ কনটেন্ট ব্যবহার করে এবং সেটিকে একটি সক্রিয় পাবলিক গ্রুপের বহু পুরোনো মেসেজের ভেতরে গোপনে এডিট করে বসিয়ে দেয়।

টেকনিক্যাল ট্রিক: দুভেরভ ব্যাখ্যা করেন, “টেলিগ্রাম বিভিন্ন মডারেশন টুলের সাহায্যে পাবলিক গ্রুপ থেকে দ্রুত অবৈধ কন্টেন্ট সরিয়ে ফেলে। সেই কারণেই হামলাকারীকে একটি কারিগরি কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছিল। সে পুরোনো মেসেজ এডিট করে সেখানে অবৈধ জিনিস ঢুকিয়ে দেয়, যাতে তা নতুন মেসেজের স্বাভাবিক প্রবাহ থেকে দূরে থাকে এবং গ্রুপের সদস্যরা তা সহজে দেখতে বা রিপোর্ট করতে না পারে।”

অ্যাপল এই কনটেন্ট লঙ্ঘনের ঘটনা এবং অ্যাপটি পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও, দুভেরভের তোলা এক্সটরশন বা ব্ল্যাকমেলিংয়ের প্রতিটি দাবি প্রকাশ্যে যাচাই করেনি।

‘টেকডাউন এক্সটরশন অ্যাটাক’ আসলে কী?
দুভেরভ বর্ণনা করেছেন যে, এই ধরনের হামলাকারীরা মূলত অনলাইন পাবলিক সম্প্রদায়গুলিকে লক্ষ্য করে এবং তাদের মালিকদের কাছ থেকে অর্থ দাবি করে। দাবি না মানলে, স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেটেড অ্যাকাউন্টগুলির মাধ্যমে নিষিদ্ধ সামগ্রী পোস্ট করে সরাসরি অ্যাপ স্টোর বা প্ল্যাটফর্মের কাছে রিপোর্ট করা হয়।

এই ধরনের ঘটনা ব্যবহারকারী-নির্মিত কনটেন্ট (User-generated content), গ্রুপ বা ভিডিও হোস্ট করা যেকোনো অ্যাপের জন্যই এক বিরাট চ্যালেঞ্জ তৈরি করে, কারণ একটি মাত্র ক্ষতিকর আপলোডের জেরে গোটা পরিষেবাটিই বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। দুভেরভ ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, “অ্যাপলের সঙ্গে যোগাযোগ করার আগেই তারা অ্যাপ স্টোর থেকে টেলিগ্রাম সরিয়ে দিয়েছিল। এক বিলিয়নেরও বেশি মানুষের ব্যবহৃত একটি অ্যাপ যদি কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই সরিয়ে ফেলা যায়, তবে যেকোনো অ্যাপই বিপদের মুখে পড়তে পারে।”

অন্যান্য ডেভেলপারদের জন্য টেলিগ্রামের সতর্কবার্তা
টেলিগ্রামের মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা এক বিলিয়নেরও বেশি। অপরাধমূলক কনটেন্ট ও মডারেশন নিয়ে অতীতেও বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে এই সংস্থা। তবে বর্তমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে দুভেরভ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, গেমিং কমিউনিটি, ফোরাম এবং অন্যান্য মেসেজিং অ্যাপের ডেভেলপারদের এই ধরনের হামলা সম্পর্কে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

তিনি ডেভেলপারদের পুরোনো পোস্ট এডিট করা, সুসংগঠিত রিপোর্টিং ক্যাম্পেইন এবং অটোমেটেড অ্যাকাউন্টগুলির ওপর কড়া নজর রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। এই ঘটনাটি ফের একবার এই পুরনো বিতর্কটিকে সামনে নিয়ে এল যে, অ্যাপ স্টোরগুলির অবৈধ কনটেন্টের বিরুদ্ধে ঠিক কত দ্রুত পদক্ষেপ করা উচিত এবং গোটা পরিষেবা নিষিদ্ধ করার আগে ডেভেলপারদের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত কি না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *