বিমা নেই তো তেলও মিলবে না! সুপ্রিম কোর্টের কড়া নির্দেশে বিপাকে গাড়ি চালকরা

তৃতীয় পক্ষের বা থার্ড পার্টি (Third Party) বিমা ছাড়াই বিপুল সংখ্যক বাইক ও গাড়ি দেদার রাস্তায় চলাচল করছে। এর ফলে কোনো গাড়ি বা বাইকের পথ দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা মৃতের পরিবার প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হয়, কিংবা তা পেতে চরম নাজেহাল অবস্থার শিকার হয়। এই গুরুতর সমস্যার মোকাবিলায় এবার সারা দেশে কেন্দ্রীয় সরকারকে পরীক্ষামূলকভাবে ‘বিমা না থাকলে, জ্বালানি মিলবে না’ নীতি চালুর নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট।

মঙ্গলবার বিচারপতি সঞ্জয় কারোল ও প্রশান্ত কুমার মিশ্রের বেঞ্চ দেশের জাতীয় সড়কগুলিতে ক্রমবর্ধমান পথ দুর্ঘটনার সংখ্যা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে, টোল প্লাজাগুলিতে গাড়িগুলির দীর্ঘ লাইনের বিষয়টি বিবেচনা করে নির্দিষ্ট কিছু করিডোরে এই নীতি পরীক্ষামূলকভাবে চালুর নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এমনকি টোল প্লাজায় গাড়ি না থামিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করার ব্যবস্থা চালুর চিন্তাভাবনা করার কথাও বলা হয়েছে।

আদালতের নির্দেশ ও পরিসংখ্যানের চিত্র
একটি মোটর দুর্ঘটনাজনিত দাবির মামলায় শুনানি চলাকালীন শীর্ষ আদালত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও কঠোর নির্দেশ জারি করেছে।

বিমাবিহীন গাড়ির পাহাড়: মোটর ভেহিকলস অ্যাক্ট অনুযায়ী সমস্ত গাড়ির থার্ড পার্টি বিমা থাকা বাধ্যতামূলক হলেও, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের অর্থনৈতিক বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী— ভারতের রাস্তায় চলাচলকারী প্রায় ৫৬ শতাংশ গাড়িরই কোনো তৃতীয় পক্ষের বীমা নেই! মোট ৩০.৪৮ কোটি যানবাহনের মধ্যে প্রায় ১৬.৫৪ কোটি গাড়িই বিমাবিহীন।

আইআরডিএ (IRDA) ও মন্ত্রকের দায়িত্ব: ইনস্যুরেন্স রেগুলেটরি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি এবং সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রক (MoRTH) নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক করবে কীভাবে জ্বালানি কেনার সময় তৃতীয় পক্ষের বিমা থাকার বিষয়টি সঠিকভাবে যাচাই করা যায়। বৈধ বিমা দেখাতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট পেট্রল পাম্পে গাড়িটিকে জ্বালানি দেওয়া হবে না।

পরীক্ষামূলক প্রকল্পের সুবিধা: আদালত জানিয়েছে এই প্রকল্পের দুটি প্রধান লাভ রয়েছে— প্রথমত, এটি সহজে বিমাবিহীন গাড়িগুলি শনাক্ত করতে সাহায্য করবে; দ্বিতীয়ত, এটি গাড়ি মালিকদের দ্রুত বিমা করাতে উৎসাহিত করবে।

বিমার নতুন মেয়াদ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
বর্ধিত সময়সীমা: ২০১৮ সালে আদালত চার চাকা গাড়ির জন্য ৩ বছর এবং দু-চাকার যানের জন্য ৫ বছর মেয়াদের থার্ড পার্টি বিমা বাধ্যতামূলক করেছিল। যদিও আইআরডিএ এবং জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কাউন্সিল (GIC) এই মেয়াদ না বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল, তবুও আদালতের বেঞ্চ জনস্বার্থে বিমার সময়সীমা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

নতুন নির্দেশ: এখন থেকে নতুন চার চাকা গাড়ির জন্য চার বছর এবং দু-চাকার যানের ক্ষেত্রে ছয় বছরের জন্য তৃতীয় পক্ষের বিমা বাধ্যতামূলক করা হলো। আইআরডিএ-কে অবিলম্বে এই মর্মে প্রয়োজনীয় নির্দেশ জারি করতে হবে।

পুলিশের জন্য ডিজিটাল মাধ্যম: বর্তমানে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে গাড়ির বিমা আছে কি না, তা যাচাই করার জন্য রাজ্য পুলিশের কাছে নির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই রাজ্য পুলিশকে হ্যান্ডহেল্ড ডিভাইস বা একটি ডাউনলোডযোগ্য অ্যাপ তৈরি করতে বলা হয়েছে, যা ইনস্যুরেন্স ইনফরমেশন ব্যুরো এবং ভিহিক্যাল পোর্টালে সংযুক্ত থাকবে। এর মাধ্যমে রিয়েল-টাইম বিমার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য চালান কাটা সহজ হবে।

বিমা না থাকার মারাত্মক পরিণতি
মোটরযান আইনের ১৪৬ ধারার অধীনে তৃতীয় পক্ষের বাধ্যতামূলক বিমার মূল উদ্দেশ্য কেবল দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া নয়, বরং তাঁরা যাতে দীর্ঘস্থায়ী আইনি লড়াইয়ে না-জড়িয়ে পড়েন তা নিশ্চিত করা। বিমা না থাকার ফলে দুর্ঘটনাগ্রস্ত ব্যক্তি বা মৃত ব্যক্তির পরিবার নির্দিষ্ট সময়ে যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পায় না। যে পরিবারগুলির উপার্জনকারী সদস্যের মৃত্যু হয়েছে বা যারা স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়েছেন, তাঁদের জন্য এর পরিণতি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও গুরুতর হয়ে ওঠে।

পাশাপাশি, আদালত আইআরডিএ-কে নির্দেশ দিয়েছে যে, মোটরযান আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ন্যূনতম কভারসহ একটি বেস পলিসির পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকদের জন্য অ্যাড-অন, ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা কভার এবং নিজস্ব ক্ষতির কভারযুক্ত বিভিন্ন পলিসির বিকল্পও প্রদান করতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *