মাদ্রাসায় ‘বন্দে মাতরম’ বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ! হাইকোর্টে বড় ধাক্কা খেল মামলাকারীরা

রাজ্যের মাদ্রাসাগুলিতে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বাধ্যতামূলক করার সরকারি নির্দেশকে ঘিরে এবার আইনি লড়াই শুরু হয়েছে কলকাতা হাই কোর্টে (Calcutta High Court)। এই নির্দেশিকার বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হলেও, আদালত আপাতত সেই নির্দেশিকায় কোনও ধরনের স্থগিতাদেশ বা অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দিতে অস্বীকার করেছে। পরিবর্তে, কেন্দ্র সরকারের মতামত জানতে চেয়ে হলফনামা তলব করেছে ডিভিশন বেঞ্চ এবং মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।
হাই কোর্টে কী যুক্তি দেওয়া হলো?
মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের সাম্প্রতিক একটি বিজ্ঞপ্তিতে রাজ্যের সমস্ত মাদ্রাসায় ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়াকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে সমাজকর্মী সৌরভ দত্ত হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন।
মঙ্গলবার কলকাতা হাই কোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়। আবেদনকারীর পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য সওয়াল করতে গিয়ে আদালতে জানান, “কেউ যদি নিজে থেকে গাইতে চান, গাইবেন। কিন্তু জোর করে গাইতে বলা যায় না। এতে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রকৃতি নষ্ট হবে।” তাঁর মতে, কোনও গান গাওয়া একান্তই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত, কোনো প্রশাসনিক নির্দেশের মাধ্যমে তা মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া আইনসম্মত নয়।
আবেদনকারীর এই পিটিশন ও লকার স্ট্যান্ডি (locus standi) নিয়ে প্রশ্ন তুলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি জানতে চান, “আপনি একজন সমাজকর্মী, আপনি কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত? আদালত কি হুট করে অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দিতে পারে? কেন্দ্রের হলফনামা ছাড়া, তাদের বক্তব্য না-জেনে এই নির্দেশ দেওয়া সম্ভব নয়।”
কেন্দ্রের বক্তব্য না শুনে এই মুহূর্তে অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেওয়া সমীচীন নয় বলে সাফ জানিয়ে দেয় আদালত। এরপর বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য অনুরোধ জানান যে, অন্তত কেন্দ্রের হলফনামা জমা পড়ার আগে পর্যন্ত যেন গান গাওয়াটা ‘বাধ্যতামূলক নয়’ বলে নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই প্রস্তাবও খারিজ করে দেয় বেঞ্চ।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও বেঞ্চের মন্তব্য
শুনানি চলাকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, “হাজার হাজার খ্রিস্টান স্কুলের প্রার্থনার সময় নানা প্রার্থনা বা গান গাওয়া হয়। এতে কি আকাশ ভেঙে পড়বে?”
এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, “সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হবে। আমরা অনেক রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা পেয়েছিলাম।” তবে এই যুক্তিতে আদালত সন্তুষ্ট হয়নি। অন্তর্বর্তী কোনো রিলিফ বা সুরক্ষা দিতে অস্বীকার করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, “এই মুহূর্তে অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেওয়া সম্ভব নয়। যদি কোনও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করা হয়, তবে আদালতকে জানাবেন।” তখন আবেদনকারীর আইনজীবী আশঙ্কা প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন যে, কাউকে জেল বা শাস্তির মুখে ঠেলে দেওয়ার পর কি তবে মামলা শোনা হবে?
পরবর্তী শুনানি কবে?
শুনানির সময় কেন্দ্রের পক্ষে অ্যাডিশনাল সলিসিটর জেনারেল ধীরাজ ত্রিবেদী আদালতে উপস্থিত হয়ে হলফনামা জমা দেওয়ার জন্য কিছু সময় প্রার্থনা করেন। সব পক্ষের বক্তব্য ও সওয়াল-জবাব শোনার পর ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়ে দেয় যে, আপাতত কোনো স্থগিতাদেশ জারি করা হচ্ছে না।
কেন্দ্রকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হলফনামা দাখিলের নির্দেশ দিয়ে মামলার পরবর্তী শুনানির দিন আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর ধার্য করেছে হাই কোর্ট। ওই শুনানির পরেই এই আইনি বিতর্কে আদালত চূড়ান্ত কোনো পদক্ষেপ বা নির্দেশ নেয় কি না, সেদিকেই নজর থাকবে সব মহলের।