ওল্ড মঙ্ক থেকে রয়্যাল চ্যালেঞ্জ— আসল মদ খাচ্ছেন তো? জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলির বিরাট প্রতারণা ফাঁস করল FSSAI!

আপনি যে মদ পান করছেন, তা কি আদৌ আসল? এই প্রশ্নটিই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের লক্ষ লক্ষ মদ্যপায়ীর মনে। কারণ, ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (FSSAI) দেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় কয়েকটি মদের ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে এক প্রকার মেগা ক্র্যাকডাউন বা কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে। ওল্ড মঙ্ক, রয়্যাল চ্যালেঞ্জ, ব্যাগপাইপার এবং অ্যান্টিকুইটি ব্লু-র মতো দেশের তাবড় জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের কিছু নির্দিষ্ট মদের বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ল্যাব টেস্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনে FSSAI জানিয়েছে যে, এই সমস্ত সংস্থা মদ তৈরির প্রচলিত ও সঠিক নিয়ম তো মানছেই না, উপরন্তু রাসায়নিক ও কৃত্রিম ফ্লেভার মিশিয়ে দিনের পর দিন গ্রাহকদের সঙ্গে মারাত্মক প্রতারণা করে চলেছে।
ল্যাব টেস্টে আসলে কী জানা গেল?
সাধারণত ভালো মানের হুইস্কি বা রাম প্রস্তুত করতে বেশ দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। মল্ট, আঙুর বা আখের মতো কাঁচামাল ফারমেন্টেশন বা গাঁজানোর পর তা বেশ কয়েক বছর ধরে প্রাকৃতিক উপায়ে কাঠ বা ওকের পিপেতে ম্যাচিউর বা পরিপক্ব হতে দেওয়া হয়। তবেই তার আসল স্বাদ, সুবাস ও গুণমান তৈরি হয়।
কিন্তু এই নামী কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত মুনাফার লোভে অত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা না করে একটি সহজ শর্টকাট পথ বেছে নিয়েছে। তারা সস্তা নিউট্রাল অ্যালকোহলের মধ্যে বাইরে থেকে কৃত্রিম রাম বা হুইস্কির রাসায়নিক ফ্লেভার মিশিয়ে দিচ্ছিল। অর্থাৎ, সস্তা স্পিরিটে হুইস্কির গন্ধ এবং রামের মধ্যে রামের গন্ধযুক্ত ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো হচ্ছিল। FSSAI-এর কঠোর আইন অনুযায়ী, বাইরে থেকে এভাবে কৃত্রিম গন্ধ বা ফ্লেভার মেশানো একটি গুরুতর অপরাধ।
কোন কোন ব্র্যান্ড এবং কোথায় কোথায় নিষেধাজ্ঞা জারি হলো?
প্রাথমিক পর্যায়ে মধ্যপ্রদেশ এবং মহারাষ্ট্রের কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রসেসিং ইউনিটে তৈরি হওয়া মদের নির্দিষ্ট ব্যাচের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
ইউনাইটেড স্পিরিটস (মধ্যপ্রদেশ): অ্যান্টিকুইটি ব্লু হুইস্কি, রয়্যাল চ্যালেঞ্জ হুইস্কি।
ইনব্রু বেভারেজেস (মধ্যপ্রদেশ): ব্যাগপাইপার ডিলাক্স হুইস্কি, ওল্ড কাস্ক ডিলাক্স রাম।
মোহন রকি স্প্রিংওয়াটার (মহারাষ্ট্র): দেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় ওল্ড মঙ্ক রামের ৩টি ভ্যারিয়েন্ট।
এই তালিকা ছাড়াও ম্যাকডোয়েলস নম্বর ১ রামের মতো আরও কিছু জনপ্রিয় প্রোডাক্ট বর্তমানে কড়া তদন্তের অধীনে রয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা আপাতত নির্দিষ্ট কিছু প্ল্যান্টে প্রস্তুত মদের ওপর জারি হলেও, তা সারা দেশে কার্যকর করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট নির্দেশিকা আসেনি।
৭ বছরের পুরনো ওল্ড মঙ্কের নামে বড় জালিয়াতি
এই তদন্তের সবচেয়ে বড় ও চাঞ্চল্যকর দিকটি হল ‘ওল্ড মঙ্ক রাম’-কে ঘিরে। বোতলের গায়ে বড় বড় অক্ষরে ‘7 ইয়ার্স ওল্ড ব্লেন্ডেড’ (অর্থাৎ ৭ বছর ধরে সংরক্ষিত পুরনো রাম) ছাপিয়ে তা বাজারে বিক্রি করা হচ্ছিল। কিন্তু FSSAI-এর ল্যাব টেস্টে ধরা পড়েছে যে, ওই মদের মধ্যে ৫ শতাংশেরও কম আসল পুরনো রাম রয়েছে! বাকি ৯৫ শতাংশের বেশি অংশই হলো স্বাদ ও গন্ধহীন সাধারণ নিউট্রাল স্পিরিট।
FSSAI স্পষ্ট জানিয়েছে, এভাবে ভুল ও বিভ্রান্তিকর লেবেল লাগিয়ে গ্রাহকদের ঠকানো ‘ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস (লেবেলিং অ্যান্ড ডিসপ্লে) রেগুলেশনস, ২০২০’-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন। নিয়ন্ত্রক সংস্থা নির্দেশ দিয়েছে যে, যদি মদ তৈরিতে রাসায়নিক ফ্লেভার ব্যবহার করা হয়, তবে বোতলের সামনের গায়ে বাধ্যতামূলকভাবে ‘রাম ফ্লেভারড স্পিরিট’ বা ‘হুইস্কি ফ্লেভারড স্পিরিট’ কথাটি স্পষ্টভাবে লিখতে হবে।
৩.৩ লক্ষ কোটি টাকার বাজারে চরম সতর্কতা
ভারতে অ্যালকোহলের ব্যবসা অত্যন্ত বিশাল। আমাদের দেশে বছরে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৩.৩ লক্ষ কোটি টাকা মূল্যের মদ বিক্রি হয়। ডিয়াজিও ইন্ডিয়া (ইউনাইটেড স্পিরিটস) এবং পেরনোড রিকার্ডের মতো বড় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি এদেশে ব্যবসা পরিচালনা করে। যে ব্র্যান্ডগুলির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, সেগুলি ভারতেই উৎপাদিত হয়। ফলে আমদানি করা স্কচ বা প্রিমিয়াম রামের তুলনায় এগুলির দাম অনেক কম হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও তরুণ প্রজন্মের কাছে এগুলির চাহিদা আকাশছোঁয়া।
FSSAI জানিয়েছে যে এই পদক্ষেপ পুরো মদ শিল্পের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ নয়, বরং যারা নিয়ম ভেঙে সাধারণ ক্রেতাদের স্বাস্থ্যের সঙ্গে খেলা করে প্রতারণা করছে, এটি শুধুমাত্র তাদের বিরুদ্ধেই এক কড়া বার্তা। ইতিমধ্যে গোয়ার ম্যান্ডেসি ডিস্টিলারিজ এবং মহারাষ্ট্রের আরও ছয়টি সংস্থাকেও শোকজ নোটিশ পাঠানো হয়েছে। কিছু কোম্পানিকে মজুত থাকা পুরনো স্টক বিক্রি করার অনুমতি দেওয়া হলেও, লেবেলে জালিয়াতি রুখতে কঠোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।