‘উরি উরি বাবা’ গাওয়ায় কি বিরক্ত হন? মঞ্চের পেছনের আসল সত্যিটা ফাঁস করলেন কিংবদন্তি উষা উত্থুপ

দর্শকদের কাছে উষা উত্থুপ মানেই রঙিন কাঞ্জিভরম শাড়ি, গলাভরা গয়না, অনবদ্য স্টেজ প্রেজেন্স আর একের পর এক জনপ্রিয় ডিস্কো গান। ‘উরি উরি বাবা’, ‘রাম্বা হো’ কিংবা নানা পার্টি অ্যান্থেমই যেন তাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে বড় অংশ। কিন্তু এই পরিচয়ের আড়ালে যে আরও এক সম্পূর্ণ অন্য উষা উত্থুপ লুকিয়ে আছেন, তাঁকে কতজন চেনেন? নিজের দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য সঙ্গীতজীবনের সেই অজানা দিকটিই এবার এক সাক্ষাৎকারে খোলামেলাভাবে তুলে ধরলেন এই কিংবদন্তি শিল্পী।

শুধু ডিস্কো গান নয়, ভজনেও সমান পারদর্শী
কথোপকথনের একপর্যায়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এমন কোনো বিষয় কি আছে, যা মানুষ এখনও তাঁর সম্পর্কে জানে না?

হেসেই উত্তর দেন উষা। তাঁর আক্ষেপ, অধিকাংশ মানুষ এখনও মনে করেন তিনি শুধু নাচের গান বা পার্টি ট্র্যাকই গেয়ে থাকেন। ‘উরি উরি বাবা’ কিংবা ‘রাম্বা হো’-এর জনপ্রিয়তা এতটাই আকাশচুম্বী যে অনেকেই বিশ্বাসই করতে পারেন না তাঁর গানের জগৎ কতটা বিস্তৃত। সেই ভুল ধারণা ভাঙতেই নিজের জীবনের কিছু স্মরণীয় অভিজ্ঞতার কথা শোনান তিনি। উষা জানান, কুম্ভমেলায় ভজন গাওয়ার জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল সরকার। সেখানে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে ভক্তিমূলক সংগীত পরিবেশন করেছেন তিনি, অথচ সেই অভিজ্ঞতার কথা খুব কম মানুষই জানেন।

শুধু তাই নয়, তাঁর জাদুকরী কণ্ঠে অতীতে বহুবার শোনা গিয়েছে ‘শিব তাণ্ডব স্তোত্রম’, ‘গণেশ বন্দনা’ এবং বাংলা প্রার্থনাসঙ্গীত ‘এ শুধু প্রার্থনা’। পাশাপাশি তাঁর গাওয়া সেই বহুল পরিচিত অনুপ্রেরণার গান—’ইয়ে মত পুছো খুদা সে, মেরি মুশকিলে বড়ি হ্যায়… মুশকিলোঁ সে কহ দো, মেরা খুদা বড়া হ্যায়’ আজও শ্রোতাদের মনে দোলা দেয়।

আধ্যাত্মিক সঙ্গীতে মজেছেন শিল্পী
এই গানগুলোর প্রসঙ্গ তুলতে গিয়েই তাঁর মন্তব্য, মানুষ তাঁর এই আধ্যাত্মিক দিকটা খুব একটা দেখতে পায় না। তিনি জানান, শঙ্কর মহাদেবনের ‘আনন্দম’ অনুষ্ঠানে দীর্ঘ সময় ধরে ভজন পরিবেশন করেছেন তিনি। সেখানে ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম’ থেকে শুরু করে ‘আইগিরি নন্দিনী’—একাধিক ভক্তিমূলক ও আধ্যাত্মিক সঙ্গীত গেয়েছেন উষা। সম্প্রতি জগন্নাথ পুরীর মন্দির উৎসবেও তাঁর গান শোনার দুর্লভ সুযোগ পেয়েছেন ভক্তরা। তাঁর স্পষ্ট কথা, এই পরিবেশনাগুলোর খবর খুব কম মানুষের কাছেই পৌঁছয়, যার জেরে এখনও তিনি অনেকের কাছে শুধুই ডিস্কো গানের শিল্পী।

গানই তাঁকে তৈরি করেছে, অহংকার নেই উষার কণ্ঠে
স্টেজে উঠলেই যখন বারবার ‘উরি উরি বাবা’ বা ‘রাম্বা হো’ গাওয়ার আবদার আসে, তখন কি কখনও বিরক্ত লাগে? প্রশ্ন শেষ হতেই একগাল হাসি ফোটে উষার মুখে। তিনি স্পষ্ট জানান, “কখনও নয়।” বরং তিনি এটাকে ঈশ্বরের এক মস্ত বড় আশীর্বাদ বলে মনে করেন।

শিল্পীর মতে, অনেক সময় শিল্পীরা মনে করেন তাঁরা গানকে জনপ্রিয় করেছেন। কিন্তু তাঁর বিশ্বাস ঠিক উল্টো। উষার কথায়, গান তাঁকে তৈরি করেছে। যদি সেই গানগুলো তাঁর জীবনে না থাকত, তবে আজ ‘উষা উত্থুপ’ নামটাই হয়তো তৈরি হতো না। এই উপলব্ধি থেকেই ভক্তদের কোনো অনুরোধ তিনি কখনও ফিরিয়ে দেন না। আজও কোনো শ্রোতা এসে বহু পুরনো গান শুনতে চাইলে যথাসাধ্য সেই আবদার পূরণ করার চেষ্টা করেন।

এই প্রসঙ্গেই তিনি সস্নেহে স্মরণ করেন সুরকার অজয় দাসের সুরে গাওয়া তাঁর প্রিয় বাংলা গান—’শুধু আকাশে কি বিদ্যুৎ চমকায়’। মঞ্চে আজও সেই গান শোনার অনুরোধ এলে তাঁর মনে আনন্দই হয়, কারণ এত বছর পরেও মানুষ গানগুলোকে ভোলেনি।

জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছেও তাই তাঁর কণ্ঠে অহংকারের লেশমাত্র নেই। প্রতিটি শ্রোতার আবদারকে তিনি সমান সম্মান জানান, কারণ তাঁদের ভালোবাসাতেই তিল তিল করে গড়ে উঠেছে তাঁর এই দীর্ঘ সঙ্গীতজীবন। যে শিল্পী মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন গান তাঁকে বড় করেছে, তাঁর কাছে জনপ্রিয়তার সংজ্ঞা যে বরাবরই অনন্য, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *