মা হওয়ার ১১ মাস পরেই ইতিহাস! গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে ডিসকাস থ্রোয়ে ব্রোঞ্জ জয়ী ভারতের সীমা

পরপর তিনটি থ্রো ফাউল। হাতে আর কোনও সুযোগ নেই। গ্যালারিতে তখন কোটি বাঙালির রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা—ক্যামেরুনের প্রতিযোগী মোনি নোরা আটিম কি তবে ছাপিয়ে যাবেন ৫৮.৬৫ মিটারের গণ্ডি?
শেষ পর্যন্ত তা আর তিনি পারেননি। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই গ্লাসগোর মাটিতে রচিত হলো এক নতুন ইতিহাস। মাতৃত্বের দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে এবং পিএইচডি-র কঠোর পড়াশোনা সামলে কমনওয়েলথ গেমসের মঞ্চে ডিসকাস থ্রোয়ে দেশের জন্য ব্রোঞ্জ পদক ছিনিয়ে আনলেন ভারতের তারকা অ্যাথলিট সীমা কলিরামনা।
কঠিন প্রত্যাবর্তন ও সংগ্রামের নেপথ্য কাহিনি
এই পদক জয় নিছক একটি সন্ধ্যার সাফল্য নয়; এর নেপথ্যে রয়েছে রক্ত-ঘাম ঝরানো অধ্যবসায়। হরিয়ানার ২৭ বছর বয়সি এই অ্যাথলিটের জীবনযাত্রা কখনওই সহজ ছিল না। ভিওয়ানির চৌধুরি বংশীলাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্যাল এডুকেশন নিয়ে পিএইচডি করার পাশাপাশি সমানতালে তিনি চালিয়ে গেছেন এলিট স্পোর্টসের নিশ্ছিদ্র প্রস্তুতি।
এর মাঝেই তাঁর জীবনে আসে এক নতুন বাঁক। মা হন সীমা, কোল আলো করে আসে পুত্র রুদ্র। কিন্তু মা হওয়ার পর ট্র্যাক থেকে বেশিদিন দূরে থাকেননি তিনি। সন্তান জন্মানোর মাত্র ১১ মাসের মাথায় ফের প্রতিযোগিতামূলক প্রশিক্ষণে ফিরে আসেন। এই কঠিন লড়াইয়ে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন তাঁর স্বামী তথা বর্তমান কোচ রবিন্দর (যিনি ক্রীড়ামহলে মনু কলিরামনা নামে পরিচিত)। একসময়ের জাতীয় স্তরের ডিসকাস থ্রোয়ার রবিন্দর স্ত্রীর এই কঠিন লড়াইয়ে ছায়ার মতো পাশে থেকেছেন।
ছন্দে ফেরা ও সাফল্যের সিঁড়ি
গর্ভাবস্থার পর ট্র্যাকে ফেরা এককথায় অগ্নিপরীক্ষা ছিল। হারিয়ে যাওয়া শারীরিক শক্তি ও পুরনো ছন্দ ফিরে পেতে সীমায় করতে হয়েছে দুর্দান্ত সংগ্রাম। ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তুলে ২০২৫ সালের ন্যাশনাল গেমসে সোনা জিতে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে আন্তর্জাতিক মঞ্চে লড়াই করার জন্য তিনি পুরোপুরি প্রস্তুত। আর এবার গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে বিশ্বমঞ্চে নিজের জাত চেনালেন তিনি।
এক থ্রোয়েই বাজিমাত ফাইনালে
মেগা ফাইনালে সীমার শুরুটা খুব একটা মসৃণ ছিল না। প্রথম থ্রোয়েই ফাউল হয় এবং ডিসকাস সোজা গিয়ে লাগে জালে। অন্যদিকে, ভারতের আরেক থ্রোয়ার নিধি রানি দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় ভালো থ্রো করে সাময়িকভাবে ব্রোঞ্জের জায়গায় পৌঁছে যান।
তবে ঠিক এর পরেই দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ান সীমা। দ্বিতীয় থ্রোয়ে ৫৭.৩২ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করার পর, তৃতীয় প্রচেষ্টাতেই আসে সেই জাদুকরি মুহূর্ত—৫৮.৬৫ মিটার! এই একটি থ্রো-ই তাঁকে পদকের মঞ্চে পৌঁছে দেয়।
চরম স্নায়ুচাপ ও পদক নিশ্চিতকরণ
ম্যাচের শেষের রাউন্ডগুলো ছিল অত্যন্ত স্নায়ুচাপের। চতুর্থ, পঞ্চম এবং ষষ্ঠ প্রচেষ্টায় পরপর ফাউল করায় সীমা নিজের স্কোর আর বাড়াতে পারেননি। এদিকে জ্যামাইকার সামান্থা হল ৬১.৬৬ মিটার ছুড়ে অনায়াসে সোনা এবং কানাডার জুলিয়া টুঙ্কস ৬০.৬৭ মিটার থ্রো করে রুপো জিতে নেন। ব্রোঞ্জের জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই ছিল ক্যামেরুনের আটিমের সঙ্গে, কিন্তু সীমার রেকর্ড ভাঙতে তিনি ব্যর্থ হওয়ায় ব্রোঞ্জ নিশ্চিত হয় ভারতের।
অন্যদিকে, ফাইনালে লড়াই করা ভারতের আরেক অ্যাথলিট নিধি রানি প্রথম থ্রোয়ে ৫৩.১৯ মিটার এবং পরবর্তীতে ৫৫.৬৭ ও ৫৭.১০ মিটারে পৌঁছলেও, শেষ পর্যন্ত চতুর্থ স্থানে সন্তুষ্ট থাকায় অল্পের জন্য মেডেল হাতছাড়া হয় তাঁর।