চিকিৎসার অভাবে বাদ গিয়েছে হাত, কমনওয়েলথে সোনা জিতলেন প্যারা অ্যাথলিট দিলীপ

গ্লাসগোর বৃষ্টিভেজা ট্র্যাকে তখন ফিনিশ লাইন থেকে আর মাত্র কয়েক মিটার দূরে। গতির ঝড় তুলে সেই দূরত্ব পার করলেন দিলীপ মাহাদু গাভিট এবং তৈরি করে ফেললেন এক সোনালী ইতিহাস। ১০.৭১ সেকেন্ডে ১০০ মিটার টি৪৭ (T47) ইভেন্ট শেষ করে কমনওয়েলথ গেমস ২০২৬-এ সোনা জিতে নিলেন এই ভারতীয় প্যারা অ্যাথলিট। কমনওয়েলথের মঞ্চে প্যারা অ্যাথলেটিক্সে ভারতের হয়ে সোনা জয়ের এই ঘটনা সম্পূর্ণ প্রথম। তবে এই ঐতিহাসিক সাফল্যের পথটা এতটুকু মসৃণ ছিল না, বরং তা ছিল চরম লড়াই ও প্রতিকূলতায় ভরা।

মহারাষ্ট্রের নাসিকের কাছে তোরণ ডোংরি গ্রামের এক গরিব কৃষক পরিবারের সন্তান দিলীপ। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে গাছ থেকে পড়ে গিয়ে ডান হাতের কনুইয়ের নিচে গুরুতর চোট পান তিনি। কিন্তু গ্রামে সেই সময়ে সঠিক ও দ্রুত চিকিৎসার অভাবে ক্ষত এতটাই মারাত্মক হয়ে দাঁড়ায় যে, শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের তাঁর ডান হাতটি কেটে বাদ দিতে বাধ্য হতে হয়।

কৃষক পরিবারের অভাবের সংসারে অনাবৃষ্টির দিনে পরিবারের সকলকে দিনমজুরের কাজ করতে হতো। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে দিলীপ সেই কাজে হাত লাগাতে পারতেন না। আর সেই কারণেই গ্রামের একাংশের মানুষের কাছে তাঁর কপালে জুটেছিল ‘অকেজো’র তকমা। পরবর্তীতে Sportstar-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দিলীপ নিজেই সেই কষ্টের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে জানান, “বৃষ্টি না হলে আমাদের পরিবার অন্যের জমিতে শ্রমিকের কাজ করত। কিন্তু আমি সেটাও করতে পারতাম না। অনেকেই আমাকে অকেজো বলে মনে করত।”

গ্রামের কাঁচা রাস্তা থেকে ট্র্যাকের লড়াই

প্রতিবন্ধকতা দমিয়ে রাখতে পারেনি দিলীপকে। ছোটবেলা থেকেই দৌড়ের প্রতি প্রবল ঝোঁক থাকায় গ্রামের কাদা-মাখা কাঁচা রাস্তা ও মাঠকেই নিজের অনুশীলনের জায়গা বানিয়ে নেন তিনি। তাঁর এই সহজাত গতি এবং প্রতিভা প্রথম নজরে আসে স্থানীয় কোচ বৈজনাথ কালের। তিনিই দিলীপের বাবা-মাকে রাজি করিয়ে তাঁকে নাসিকে নিয়ে যান এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। এমনকী প্রথমদিকে দিলীপের থাকা-খাওয়ার সমস্ত খরচ কোচ নিজেই বহন করেন।

ধীরে ধীরে জাতীয় স্তর পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের জায়গা পাকা করেন দিলীপ। কেন্দ্রীয় ক্রীড়া মন্ত্রকের ‘টার্গেট অলিম্পিক পোডিয়াম স্কিম’ (TOPS)-এর আর্থিক সহায়তার সুবাদে তিনি সাতটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। এর আগে ২০২২ সালের এশিয়ান প্যারা গেমসে ৪০০ মিটার দৌড়ে সোনা এবং ২০২৪ প্যারিস প্যারালিম্পিক্সেও ফাইনালে পৌঁছে নজর কেড়েছিলেন তিনি। আর এবার গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে ১০০ মিটারে সোনা জিতে মুকুটে জুড়লেন সবচেয়ে বড় রত্নটি।

কোচের প্রতি চরম কৃতজ্ঞতা ও আবেগ

গেমসে সোনা জয়ের পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি ২৩ বছর বয়সি দিলীপ। চোখের জলে নিজের সমস্ত সাফল্য কোচ বৈজনাথ কালেই উৎসর্গ করে তিনি বলেন, “উনি শুধু আমার কোচ নন। আমি ওঁর বাড়িতেই থাকি, ওঁর সঙ্গেই খাওয়াদাওয়া করি। উনি আমাকে নিজের সন্তানের মতো মানুষ করেছেন। খাওয়ানো, পড়াশোনা, ট্রেনিং— সব কিছুই ওঁর জন্য সম্ভব হয়েছে। উনি আমার কাছে বাবার মতো। আজ আমি যেখানে পৌঁছেছি, সবটাই ওঁর জন্য।” প্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এক সাধারণ যুবকের বিশ্বজয় করার এই অনুপ্রেরণামূলক গল্প এখন গোটা দেশের চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *