কেন্দ্রহীন ভেসে বেড়াচ্ছে ‘ভবঘুরে’ ব্লাক হোল, বিরল দৃশ্য দেখে কী বলছে বিজ্ঞানীরা?

মহাকাশ বিজ্ঞানের দুনিয়ায় ঘটে গেল এক অত্যন্ত বিরল ও চমকপ্রদ ঘটনা। বিজ্ঞানীরা ছায়াপথের (Galaxy) কেন্দ্রস্থল থেকে বহুদূরে মহাশূন্যে ভেসে বেড়ানো এক দানবাকার ‘ভবঘুরে’ ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বরের সন্ধান পেয়েছেন। গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার মহাবিশ্বে দুটি ছায়াপথের সংঘর্ষ ও একীভূত হওয়ার পর বিশালকায় কৃষ্ণগহ্বরগুলি কীভাবে নতুন পথ তৈরি করে এবং চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, সে সম্পর্কে মানবজাতির প্রচলিত ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে।

আমেরিকার ‘ইউনিভার্সিটি অফ নর্থ ক্যারোলাইনা অ্যাট চ্যাপেল হিল’-এর একদল গবেষকের এই যুগান্তকারী গবেষণাটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স’ (Astrophysical Journal Letters)-এ।

কী এই ‘টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট’ বা টিডিই?

নোরিজ (Noriz)-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পুরো গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে ‘টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট’ (Tidal Disruption Event বা TDE) নামের এক অত্যন্ত বিরল মহাজাগতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে। কোনো একটি তারা (Star) যখন মহাশূন্যে ভাসতে ভাসতে কোনো বিশালকায় কৃষ্ণগহ্বরের খুব কাছাকাছি চলে আসে, তখন এই ঘটনা ঘটে।

এ সময় কৃষ্ণগহ্বরের প্রচণ্ড ও বিধ্বংসী অভিকর্ষ বলের (Gravity) টানে তারাটি মুহূর্তের মধ্যে ছিন্নভিন্ন ও চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় এবং তার ফলেই মহাকাশে এক আলোর তীব্র ঝলকানি তৈরি হয়। আলোর এই প্রখর ও উজ্জ্বল ছটাই সাধারণত অদৃশ্য হয়ে থাকা এবং চিরকাল লুকিয়ে থাকা কৃষ্ণগহ্বরটিকে ক্ষণিকের জন্য দৃশ্যমান বা উন্মোচিত করে তোলে।

কেন এই আবিষ্কারটি ব্যতিক্রমী?

মহাকাশে এই ধরনের ঘটনা অত্যন্ত বিরল। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, সাধারণত একটি ছায়াপথে প্রতি এক লাখ বছরে মাত্র একবার এমন ‘টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট’ ঘটতে দেখা যায়।

  • গত এক দশকে বিজ্ঞানীরা এমন শতাধিক আলোর ঝলকানি শনাক্ত করলেও, সেগুলির প্রায় সবই ঘটেছিল বিভিন্ন ছায়াপথের একেবারে কেন্দ্রস্থলে (Center)। কারণ বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, সবচেয়ে বড় আকারের কৃষ্ণগহ্বরগুলি সবসময় ছায়াপথের কেন্দ্রেই অবস্থান করে।

  • কিন্তু সাম্প্রতিক আবিষ্কৃত ‘টিডিই ২০২৫এবিসিআর’ (TDE 2025ABCR) নামের এই ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী। এটি ছায়াপথের কেন্দ্রের কাছাকাছি ঘটার পরিবর্তে কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে সংঘটিত হয়েছে! দৃশ্যমান আলোয় দেখা যাওয়া কোনো টিডিই-এর ক্ষেত্রে ছায়াপথ কেন্দ্র থেকে এত বেশি দূরত্বের রেকর্ড এটিই প্রথম।

এই আবিষ্কার থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, আমাদের সূর্যের চেয়ে প্রায় ১০ লাখ গুণ বেশি ভরের একটি বিশাল ‘ভবঘুরে’ কৃষ্ণগহ্বর মহাশূন্যে একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিজ্ঞানীদের অনুমান, বহু কোটি বছর আগে দুটি গ্যালাক্সি বা ছায়াপথের মধ্যে সংঘর্ষ ও একীভূত হওয়ার পর এই কৃষ্ণগহ্বরটি মূল কেন্দ্র থেকে আলাদা হয়ে ছিটকে বেরিয়ে এসেছে। অথবা অন্য কোনো বড় কৃষ্ণগহ্বরের সঙ্গে শক্তিশালী অভিকর্ষীয় ধাক্কার ফলেও এটি দূরে সরে যেতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর জাদুকরী ভূমিকা

তারার মতো ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর নিজস্ব কোনো আলো তৈরি করতে পারে না, ফলে এদের খালি চোখে বা সাধারণ উপায়ে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। সাধারণত আশপাশের কোনো বস্তুর ওপর এদের ধ্বংসাত্মক প্রভাব দেখেই বিজ্ঞানীরা এদের উপস্থিতি টের পান। এক্ষেত্রে পাশ দিয়ে যাওয়া একটি তারার ধ্বংস হয়ে যাওয়া যেন একটি মহাজাগতিক ‘সার্চলাইট’ হিসেবে কাজ করেছে, যা লুকিয়ে থাকা এই ব্ল্যাকহোলটিকে পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের সামনে নিয়ে এসেছে।

এই দূরহ ও জটিল কাজটি সফল করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)। দূরবীক্ষণ যন্ত্রের বিশাল তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন টিডিই শনাক্ত করতে গবেষক দল ‘টিডিইস্কোর’ (TDEScore) নামের একটি বিশেষ এআই প্রোগ্রাম তৈরি ও ব্যবহার করেছিলেন। ছায়াপথের কেন্দ্রের গতানুগতিক অনুসন্ধান পদ্ধতির বাইরে গিয়ে কেন্দ্র থেকে অনেক দূরের অঞ্চলগুলোতে নজর দেওয়ার জন্য এই এআই সিস্টেমটিকে বিশেষভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল।

ফলস্বরূপ, প্রচলিত অনুসন্ধানের চোখ এড়িয়ে যাওয়া এই বিরল ঘটনাটি নিখুঁতভাবে ধরা পড়ে। এআই যখন এই অস্বাভাবিক আলোর ঝলকানিটি শনাক্ত করে, তখন চিলিতে অবস্থিত ‘সাউদার্ন অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল রিসার্চ’ (SOAR) টেলিস্কোপ ব্যবহার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এর সঠিক প্রকৃতি নিশ্চিত করেন।

নতুন দিগন্তের সূচনা

এই আবিষ্কারের ফলে প্রমাণিত হলো যে, পৃথিবীভিত্তিক অপটিক্যাল টেলিস্কোপ বা দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েই মহাকাশের ভবঘুরে ও একাকী কৃষ্ণগহ্বরগুলি খুঁজে বের করা সম্ভব। কারণ পাশ দিয়ে যাওয়া কোনো তারাকে গ্রাস বা ধ্বংস না করা পর্যন্ত এই একাকী ব্ল্যাকহোলগুলি প্রায় পুরোপুরি অদৃশ্যই থাকে।

বিজ্ঞানীদের অনুমান, এই সন্ধান কেবল একটি নতুন পথের সূচনা মাত্র। অদূর ভবিষ্যতে ‘ভেরা সি. রুবিন অবজারভেটরি’ (Vera C. Rubin Observatory) এবং ‘আর্গাস অ্যারে’ (Argus Array)-এর মতো নতুন ও অত্যাধুনিক পর্যবেক্ষণাগারগুলি পুরোপুরি চালু হলে প্রতি বছর শত শত বা হাজার হাজার এমন টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট আবিষ্কৃত হবে। এই অগ্রগতি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের আরও বহু ভবঘুরে কৃষ্ণগহ্বর খুঁজে পেতে এবং কোটি কোটি বছর ধরে এগুলি কীভাবে তৈরি হয়, বিশালাকার ধারণ করে এবং মহাবিশ্বে ঘুরে বেড়ায়, তার সঠিক রহস্য উন্মোচন করতে সাহায্য করবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *