আমেরিকা-ইরান যুদ্ধে রণক্ষেত্র মধ্যপ্রাচ্য! হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে হামলায় নিহত ভারতীয়, জাতিসংঘে গর্জে উঠলো ভারত!

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ছায়াযুদ্ধ এবার পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতের রূপ নিয়েছে। একদিকে তেহরানের ওপর ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে ওয়াশিংটন, অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে নিশানা বানাচ্ছে ইরান। এই যুদ্ধাবস্থার মাঝেই বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন ‘হরমুজ প্রণালী’ (Strait of Hormuz)-তে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলায় এক ভারতীয় প্রাণ হারিয়েছেন, ১ জন নিখোঁজ এবং বহু ভারতীয় নাবিক গুরুতর আহত হয়েছেন।
এই পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সোচ্চার হয়েছে ভারত। উত্তেজনা প্রশমন এবং আন্তর্জাতিক জলপথে অবিলম্বে নিরবচ্ছিন্ন নৌচলাচল চালুর জোর দাবি জানিয়েছে দিল্লি।
হরমুজ প্রণালীতে রক্তপাত: জাতিসংঘের মঞ্চে সরব ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি
জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত পার্বথানেনি হরিশ পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন। এ মাসে জিএফএস গ্যালাক্সি, এমটি আল বাহিয়া এবং এমটি মোম্বাসা জাহাজে হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন:
“আন্তর্জাতিক জলপথে নির্দোষ নাবিকদের ওপর হামলা এবং অবাধ নৌচলাচল ব্যাহত করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বেসামরিক জাহাজ এবং পরিকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানানো অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। ভারত সবসময় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সংলাপ ও কূটনীতির পক্ষে।”
জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী, ৬ জুলাইয়ের পর ১১ জুলাই ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণা দিলে এই রুট দিয়ে দৈনিক ১০০টি জাহাজের যাতায়াত কমে মাত্র ৮ থেকে ১৫টিতে এসে ঠেকেছে, যার ফলে বিশ্ব বাণিজ্য মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
কেন পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ থামা ভারতের জন্য অত্যন্ত জরুরি?
জাতিসংঘের বৈঠকে রাষ্ট্রদূত হরিশ স্পষ্ট করে তুলে ধরেন কেন এই অঞ্চলের শান্তি ভারতের অর্থনীতির জন্য জীবন-মরণের প্রশ্ন:
১ কোটি ভারতীয়ের জীবন: বর্তমানে উপসাগরীয় দেশগুলোতে প্রায় ১ কোটি ভারতীয় নাগরিক বসবাস ও কাজ করেন। তাঁদের নিরাপত্তা রক্ষা করা ভারতের প্রধান অগ্রাধিকার।
বিশাল বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স: পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে ভারতের বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ১৮০ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া প্রবাসীরা প্রতি বছর এই অঞ্চল থেকে ভারতে প্রায় ৫২ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠান এবং জিসিসি দেশগুলো থেকে ভারতে ৩১ বিলিয়ন ডলারের বেশি এফডিআই (FDI) এসেছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা: ভারতের খনিজ তেল ও গ্যাসের প্রধান রুট এই হরমুজ প্রণালী। এটি অবরুদ্ধ থাকা মানেই ভারতে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হওয়া।
গাজা, ইয়েমেন ও লেবানন ইস্যুতেও ভারতের স্পষ্ট অবস্থান
শুধু ইরান-মার্কিন যুদ্ধই নয়, পশ্চিম এশিয়ার সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন ভারতীয় প্রতিনিধি:
গাজার মানবিক সংকট: বিশ্ববাসীর নজর এখন হরমুজ প্রণালীর দিকে থাকলেও গাজার মারাত্মক মানবিক বিপর্যয়কে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয় বলে সতর্ক করেছে ভারত। স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সমর্থনে ভারতের অটল অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
ইয়েমেন ও লোহিত সাগরে হুথি হামলা: ইয়েমেনের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার সমর্থনের পাশাপাশি বাব আল-মানদেব প্রণালী ও লোহিত সাগরে হুথিদের সামুদ্রিক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে দিল্লি।
লেবাননে শান্তিরক্ষী বাহিনীর নিরাপত্তা: লেবাননে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী (UNIFIL)-র ওপর যে কোনো আক্রমণের কড়া সমালোচনা করে ভারত জানিয়েছে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কাজ করা শান্তিরক্ষীদের ওপর হামলা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।
উপসংহার:
উপসাগরীয় অঞ্চলের একের পর এক হামলায় ভারতীয়দের প্রাণহানি এবং অর্থনীতির ওপর হুমকির মুখেই দিল্লি আর চুপ নেই। যুদ্ধ নয়, আলোচনার টেবিলেই যে স্থায়ী সমাধান সম্ভব—জাতিসংঘে সেই স্পষ্ট বার্তাই পৌঁছে দিল ভারত।