জরায়ুতে ৯টি বড় টিউমার! জন্মদিনের মাসেই সাড়ে ৪ ঘণ্টার জটিল অস্ত্রোপচারের মুখে জনপ্রিয় অভিনেত্রী তন্বী লাহা রায়

‘মিঠাই’ ধারাবাহিক খ্যাত জনপ্রিয় অভিনেত্রী তন্বী লাহা রায়ের (Tonni Laha Roy) জীবনের এই বছরের জন্মদিনের মাসটা যে এতটা মর্মান্তিক ও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে কাটবে, তা তিনি নিজেও কল্পনা করতে পারেননি। সাধারণত জন্মদিনের এই বিশেষ সময়টা আনন্দ উদযাপন কিংবা কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনাতেই কাটানোর কথা থাকলেও, এবার আনন্দের দিনগুলি পরিণত হয়েছে গভীর বিষাদে। ঘুরতে যাওয়ার সমস্ত টিকিট বাতিল তো করতে হয়েছেই, উল্টে দিনের পর দিন কাটছে হাসপাতালের বিছানায়। রাতভর ঘুমহীনতা, বুকচাপা উদ্বেগ, একের পর এক রক্ত পরীক্ষা, এমআরআই (MRI) আর ইনজেকশনের যন্ত্রণার মাঝেই কেটেছে তাঁর দিনগুলি।
জরায়ুতে বাসা বেঁধেছিল ৯টি ফাইব্রয়েড
সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের জীবনের এই ভয়ানক অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নিয়ে অভিনেত্রী লিখেছেন, “এই বছরের বার্থডে মান্থটা যে এই ভাবে কাটবে, কখনও ভাবিনি। বার্থডে সেলিব্রেট দূরের কথা, ঘুরতে যাওয়ার টিকিটও ক্যানসেল করতে হল।” একের পর এক মেডিক্যাল রিপোর্টের পাতা উল্টে চিকিৎসকরা জানতে পারেন, তাঁর জরায়ুতে একে একে বাসা বেঁধেছে মোট ৯টি ফাইব্রয়েড টিউমার! এর মধ্যে দু’টি টিউমারের আকার ছিল প্রায় সাড়ে ৯ সেন্টিমিটারের কাছাকাছি, যা আকৃতিতে প্রায় “দুটি ৬ মাসের শিশুর সাইজ়”-এর সমান। বাকি টিউমারগুলি ছিল মাঝারি আকারের। টিউমারগুলির এমন অস্বাভাবিক আকার ও স্পর্শকাতর অবস্থান দেখে সমস্ত চিকিৎসক একটাই কথা সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, অস্ত্রোপচার ছাড়া এই রোগ মুক্তির আর দ্বিতীয় কোনো পথ নেই।
চিকিৎসকের ওপর ভরসা ও সফল অপারেশন
জীবনের প্রথম এত বড় কোনো অস্ত্রোপচারের মুখোমুখি হওয়ার খবরে স্বাভাবিকভাবেই ভয় পেয়েছিলেন তন্বী। প্রায় এক মাস ধরে শহরের একাধিক চিকিৎসকের দরজায় দরজায় চক্কর কেটেছেন, গাদা গাদা রিপোর্ট আর এমআরআই করিয়েছেন। কিন্তু মনের ভেতর একটাই প্রশ্ন তাঁকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল—কার হাতে নিজের জীবনের প্রথম অপারেশনটি তুলে দেবেন? কাকে ভরসা করবেন? অবশেষে তাঁর এই মুশকিল আসান করেন প্রখ্যাত চিকিৎসক ড. নীলভ ভাদুড়ী। তন্বী জানিয়েছেন, ওই চিকিৎসক অত্যন্ত ধৈর্য ধরে তাঁর সমস্ত ফাইলপত্র খুঁটিয়ে দেখেন, তাঁকে সান্ত্বনা দেন এবং মাঝেমধ্যে হালকা ইয়ার্কি-ঠাট্টা করে তাঁর মনের ভিতরের ভয়টাও অনেকটা হালকা করে দিয়েছিলেন।
ডাক্তারের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেই শেষ পর্যন্ত অপারেশনের টেবিলে যান অভিনেত্রী। একটানা সাড়ে চার ঘণ্টার এক দীর্ঘ ও অত্যন্ত জটিল অস্ত্রোপচারের পর অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তাঁর শরীর থেকে সমস্ত টিউমারগুলি বের করে আনা হয়। এই সফল চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের প্রতি অন্তরের অন্তস্তল থেকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি।
কঠিন সময়ে পাশে পেয়েছেন পরিচালক ও পরিবারকে
এই গুরুতর অসুস্থতার মাঝেই একটি নতুন ওয়েব সিরিজে লিড রোলে অভিনয় করার কথা চলছিল তাঁর। কিন্তু শুটিং শুরু হওয়ার আগেই এই রোগের কবলে পড়ায় তন্বী আশঙ্কা করেছিলেন যে, নির্মাতারা তাঁকে হয়তো চরিত্র থেকে বাদ দিয়ে দেবেন। কিন্তু আদতে তা মোটেও হয়নি! পরিচালক অরিন্দম শীল ও প্রযোজনা সংস্থা তাঁকে বাতিলের খাতায় না ফেলে উল্টো শক্ত হাতে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। ডাক্তার ও টেস্টের দৌড়ঝাঁপের মাঝেই যতটা সম্ভব শুটিং সেরেছিলেন তিনি। পুরো কাজ শেষ হওয়ার আগেই অস্ত্রোপচার করাতে হলেও, বাকি একদিনের শুটিংয়ের জন্য তাঁকে পর্যাপ্ত সময় দিয়েছেন প্রযোজক-পরিচালক। সহকর্মীদের এই নিঃশর্ত ভরসার কথা তিনি জীবনেও ভুলবেন না বলে জানিয়েছেন। পাশাপাশি, এই বিপদের দিনে পরিবারের ভালোবাসার মানুষগুলোর অকুণ্ঠ সমর্থন তাঁকে মানসিকভাবে অনেকটাই শক্তি জুগিয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।
চেনা ফ্লোরে ফেরার অপেক্ষা
আপাতত চিকিৎসকদের পরামর্শে সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া তথা রিকভারি ফেজ (Recovery phase)-এর মধ্যে রয়েছেন তন্বী লাহা রায়। আগামী ২৭ জুলাই তাঁর জন্মদিনের ঠিক মুখেই এই মারাত্মক ধকল সামলে উঠে তাঁর একটাই লক্ষ্য—খুব দ্রুত নিজের চেনা শ্যুটিং ফ্লোরে ফিরে যাওয়া। তন্বীর সোজা কথা, “শুটিং আর ক্যামেরার সামনে থাকা হল আমার ভালো থাকার ওষুধ।” সব প্রতিকূলতাকে দূরে সরিয়ে ভক্তিতে চোখ বুজে তাই নিজের পোস্টে তিনি লিখেছেন, “জয় মা তারা, হর হর মহাদেব।”