দৈনিক ১ লক্ষ বিমান চললেও এই আকাশ সম্পূর্ণ ফাঁকা কেন? ভৌগোলিক দূরত্ব না কি অন্য কোনো রহস্য?

প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে ১ লক্ষেরও বেশি বিমান বিভিন্ন শহরের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করলেও, বিশ্বের বিমান রুটের মানচিত্রে একটি বড় শূন্যতা স্পষ্ট—তা হল দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকাকে সরাসরি যুক্ত করা যাত্রীবাহী বিমানের সংখ্যা প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ এই দুই অঞ্চলের মোট জনসংখ্যা প্রায় ২০০ কোটি। এক শতাব্দীরও বেশি বিমান চলাচলের ইতিহাসে একসময় উত্তর আটলান্টিকের তুলনায় দক্ষিণ আটলান্টিককে অধিক কার্যকর করিডর হিসেবে ধরা হলেও, বর্তমানে কেন এই আকাশ ফাঁকা? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে অর্থনীতি ও প্রযুক্তির সমীকরণে।

ভৌগোলিক দূরত্ব বা জরুরি অবতরণের সংকট কি একমাত্র কারণ?
প্রাথমিকভাবে মনে হতে পারে, দুই তীরের মধ্যে সমুদ্রের দূরত্বই এর মূল বাধা। কিন্তু বাস্তবে ব্রাজিলের নাটাল থেকে সিয়েরা লিওনের ফ্রিটাউনের দূরত্ব মাত্র ২,৯০০ কিলোমিটার, যা নিউ ইয়র্ক–লন্ডন রুটের (৫,৫০০ কিমি-র বেশি) তুলনায় অনেক কম। তবে সুরক্ষার নিয়মানুযায়ী দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট বিমানের ক্ষেত্রে ৬০ মিনিটের মধ্যে নিকটতম বিমানবন্দরে পৌঁছানোর বাধ্যবাধকতা থাকে। দক্ষিণ আটলান্টিকে সেন্ট হেলেনা বা অ্যাসেনশন দ্বীপের মতো সীমিত বিকল্প থাকায় কিছু প্রযুক্তিগত জটিলতা তৈরি হয় বটে, তবে অতীতে চার ইঞ্জিনবিশিষ্ট ‘জেপেলিন’ বা বিমান নিয়মিত চলাচল করায় প্রমাণিত হয় যে, কেবল ভৌগোলিক দূরত্ব এর একমাত্র কারণ নয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ১৯২০-এর দশকে যেমন ছিল চিত্র
১৯২২ সালে পর্তুগিজ বিমানচালক দল এবং পরবর্তীতে ১৯২৭ সালে ফরাসি দল দক্ষিণ আটলান্টিক পার হয়ে প্রথম নন-স্টপ উড়ান সম্পন্ন করে। ১৯৩০-এর দশকে জার্মানির বিখ্যাত ‘গ্রাফ জেপেলিন’ (Graf Zeppelin) হাইড্রোজেনচালিত এয়ারশিপ নিয়মিত ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে রিও ডি জেনেইরো পর্যন্ত যাতায়াত করত। সেই সময় উত্তর আটলান্টিকের জেত স্ট্রিম ও প্রতিকূল আবহাওয়া বিপজ্জনক মনে হলেও, পরবর্তী সময়ে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান এবং উত্তর গোলার্ধকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোর উত্থানের ফলে বিমান সংস্থাগুলি লাভজনক উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের রুটে বেশি বিনিয়োগ শুরু করে। ফলস্বরূপ দক্ষিণ আটলান্টিকের রুটগুলি গুরুত্ব হারাতে শুরু করে।

জনসংখ্যা বনাম অর্থনৈতিক বৈষম্য
আফ্রিকার প্রায় ১৫০ কোটি এবং দক্ষিণ আমেরিকার প্রায় ৪৫ কোটি—সব মিলিয়ে ২০০ কোটি জনসংখ্যা হলেও এই দুই মহাদেশের অর্থনৈতিক আকার ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার তুলনায় অনেক কম। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের সম্মিলিত অর্থনীতির আকার যেখানে প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, সেখানে দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার জিডিপি তার দশভাগের এক ভাগের কাছাকাছি। ফলে আন্তঃমহাদেশীয় বিমানের টিকিট কেনার মতো আর্থিক সামর্থ্যসম্পন্ন যাত্রীর সংখ্যা এই অঞ্চলে অনেক কম, যা নিয়মিত বিমান পরিষেবা টিকিয়ে রাখার প্রধান অন্তরায়।

ব্রাজিল ও জোহানেসবার্গ কেন্দ্রিক সীমিত সংযোগ
বর্তমানে এই দুই মহাদেশের মধ্যে যেটুকু সংযোগ রয়েছে, তা মূলত ‘ব্রাজিলকেন্দ্রিক’। ব্রাজিলের সাও পাওলোর সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ ও কেপ টাউনের সীমিত সরাসরি ফ্লাইট চালু রয়েছে। এছাড়া ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবা থেকে সাও পাওলো হয়ে বুয়েনস আইরেস পর্যন্ত বিমানের সংযোগ বা অ্যাঙ্গোলা ও কেপ ভার্দের সঙ্গে ঐতিহাসিক পর্তুগিজ সংযোগের সুবাদেই সামান্য কিছু রুট টিকে রয়েছে। উচ্চ আয়সম্পন্ন ও অধিক যাত্রীসমৃদ্ধ বড় হাবের অভাবে নতুন রুট চালুর ক্ষেত্রে বিমান সংস্থাগুলোর আগ্রহও তলানিতে ঠেকেছে।

উত্তর বনাম দক্ষিণ আটলান্টিকের আকাশ: এক তুলনামূলক চিত্র
বিপরীত চিত্র দেখা যায় উত্তর আটলান্টিকের ক্ষেত্রে, যেখানে প্রতিদিন প্রায় ২,০০০ বিমান আমেরিকা ও ইউরোপকে যুক্ত করে। ব্যাংকিং, প্রযুক্তি, ওষুধ ও কূটনীতির মতো উন্নত অর্থনৈতিক খাত এবং ব্যবসার বিপুল চাহিদার কারণেই উত্তর আটলান্টিকের আকাশ সবসময় ব্যস্ত থাকে। অন্যদিকে, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কাঠামো তুলনামূলকভাবে কম সংগঠিত হওয়ায় যাতায়াতের চাহিদাও অনেক কম। আর সে কারণেই দক্ষিণ আটলান্টিকের আকাশ আজও প্রায় ফাঁকাই রয়ে গিয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *