‘এমন ব্যবস্থা নেব যা তিন পুরুষ মনে রাখবে!’ বিধানসভায় গুন্ডাদমন আইনের হুঙ্কার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর

গত শুক্রবার কলকাতার ধর্মতলার ডোরিনা ক্রসিংয়ে ছাত্র ও যুব সংগঠনের একটি মিছিলকে কেন্দ্র করে যে নজিরবিহীন রণক্ষেত্র পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল এবং সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের উপর যে জঘন্য হামলার ঘটনা ঘটেছিল, তার বিরুদ্ধে এবার বিধানসভার অন্দরে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বিধানসভার অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি সাংবাদিকদের উপর এই শারীরিক হেনস্থার তীব্র নিন্দা জানান। একইসঙ্গে, এই হিংসাত্মক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত মোট ৭০ জন উপদ্রবকারীকে চিহ্নিত করার কথা জানিয়ে বিধানসভাতেই ৫ জন অভিযুক্তের নাম প্রকাশ্যে এনেছেন মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কড়া ‘গুন্ডাদমন আইন’ (Goon Act) প্রয়োগ করার চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল বিষয়গুলি:
-
পুলিশকে সংযমের নির্দেশ: মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভাকে জানান যে, সরকারের পক্ষ থেকে আগেই পুলিশ প্রশাসনকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যেন পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ না করলে কোনোমতেই অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা না হয়। মিছিলটি শান্তিপূর্ণভাবে এগোলেও এবং পুলিশের প্রাক-অনুমান অনুযায়ী প্রায় ৯ হাজার মানুষের জমায়েত হলেও, ডোরিনা ক্রসিংয়ে পৌঁছানোর পরই পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে যায়। বিক্ষোভকারীরা আচমকাই পুলিশ ও সংবাদমাধ্যমের উপর জুতো ও জলের বোতল ছুড়ে আক্রমণ শুরু করে। তবে এত বড় প্ররোচনার মুখেও পুলিশ চূড়ান্ত সংযম বজায় রাখায় ডিউটিরত পুলিশকর্মীদের ধন্যবাদ জানান তিনি।
-
৭টি মামলা ও গুন্ডাদমন আইন: সাংবাদিকদের উপর হামলার এই ঘটনায় মোট ৭টি এফআইআর (FIR) দায়ের করা হয়েছে এবং মামলাগুলিতে অত্যন্ত কঠোর ‘গুন্ডাদমন আইন’ ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
-
চিহ্নিত ৭০ ও অভিযুক্তদের নাম: এই হামলার নেপথ্যে থাকা মোট ৭০ জন দুষ্কৃতীকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাঁরা আদতে কোনো ছাত্র নন বলেই সাফ দাবি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বিধানসভায় তিনি সুনির্দিষ্টভাবে ৫ জনের নাম উল্লেখ করে জানান—রাজাবাগানের আফরোজ, খিদিরপুরের নাহিদ, এবং মোমিনপুরের তনভির ইকবাল-সহ অন্যরা এই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে।
-
কঠোরতম পদক্ষেপের বার্তা: দুষ্কৃতীদের উদ্দেশ্যে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন—
“গুন্ডাদমন আইনে এমন ব্যবস্থা নেব যাতে গুন্ডাদের শুধু এক পুরুষ নয়, তিন পুরুষ মনে রাখবে এই ধরনের বেআইনি ঘটনা ঘটানোর আগে! ঠিক এই কারণেই গুন্ডাদমন আইন পাশ করা হয়েছিল, এবার মানুষ নিজেই দেখতে পাবে এর কার্যকারিতা কতটা।”
শুক্রবার ডোরিনা ক্রসিংয়ে ঠিক কী ঘটেছিল?
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার দুপুর ২টো নাগাদ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ছাত্র-যুব সংগঠনের ব্যানারে ডোরিনা ক্রসিং চত্বরে এক বিশাল জমায়েত হয়েছিল। পুলিশের কোনো পূর্বানুমতি না থাকা সত্ত্বেও AIDSO, AIDYO, CPIM(L), DYFI, AISA, PDSF, AFSA, DSF, ISU এবং APDR-সহ একাধিক সংগঠনের নেতৃত্বে এই মিছিলের আয়োজন করা হয়।
পুলিশের তরফ থেকে অভিযোগ করা হয় যে:
-
মাইক ব্যবহার করে লাগাতার উসকানিমূলক বক্তব্য রেখে সম্পূর্ণ ডোরিনা ক্রসিং চত্বরটি বেআইনিভাবে জ্যাম ও দখল করার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছিল।
-
সমাবেশকে বেআইনি ঘোষণা করে দ্রুত এলাকা খালি করার নির্দেশ দেওয়া হলেও আন্দোলনকারীরা তা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেন।
-
নেতৃত্বের উসকানিতে ভিড়ের মধ্য থেকেই পুলিশ কর্মী, সাধারণ পথচারী এবং দায়িত্বপালনরত সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের লক্ষ্য করে লাঠি, পাথর, জুতো ও জলের বোতল বৃষ্টিষ্পায় ছোঁড়া হয়।
এর ফলে দীর্ঘক্ষণ কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে যান চলাচল সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গেলেও পুলিশ শেষ পর্যন্ত চরম সংযম বজায় রেখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং সন্ধ্যার দিকে বিক্ষোভকারীরা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন। বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর এই অনমনীয় ও কঠোর অবস্থানের পর এই ঘটনায় ধৃত ও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনি খাঁড়া যে আরও নামতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।