তেলাপোকা জনতা পার্টির উত্থান থেকে সোনম ওয়াংচুকের অনশন! ডামাডোলের সেই ৭০ দিনের সম্পূর্ণ ক্রনিকল

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে তোলপাড় করে দেওয়ার জন্য মাত্র ৭০ দিনই যথেষ্ট ছিল। নিট-ইউজি (NEET-UG) প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন দেখতে দেখতে এমন এক রূপ নেয়, যা শুধু শিক্ষাব্যবস্থাই নয়, গোটা জাতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনকেও একেবারে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী রাস্তায় নেমে আসেন, যার জেরে কেন্দ্র ও বিরোধীদের মধ্যে শুরু হয় তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত। এই গোটা সময়ের মধ্যে জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP) নামক একটি নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ, যন্তর-মন্তরে আসেন সোনম ওয়াংচুক, এবং শেষ পর্যন্ত প্রবল চাপে পড়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। আসুন, এই ঝড়ো ৭০ দিনে ঘটে যাওয়া সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো একনজরে খতিয়ে দেখা যাক।

১. আন্দোলনের সূত্রপাত (NEET UG প্রশ্নপত্র ফাঁস)

সারাদেশ জুড়ে সর্বভারতীয় মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট-ইউজি’-র প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সামনে আসার মাধ্যমেই এই পুরো অস্থিরতার সূত্রপাত হয়েছিল। পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রথম থেকেই ফুঁসে উঠেছিল শিক্ষার্থীরা। প্রাথমিকভাবে আন্দোলনটি পরীক্ষা বাতিল, পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া এবং দোষীদের শাস্তির দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও, পরবর্তীতে তা এক বিশাল রূপ নেয়। সরকার তদন্ত শুরু করে কিছু গ্রেফতার করলেও, ছাত্রছাত্রীরা সাফ জানিয়ে দেয় যে— কেবল আইওয়াশ বা খুচরো গ্রেফতারি যথেষ্ট নয়, পুরো সিস্টেমের উচ্চপর্যায়ের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

২. রাজনৈতিক মোড় ও ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ উত্থান

ছাত্রদের এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করার সঙ্গে সঙ্গেই তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। রাজপথ থেকে সংসদ—সর্বত্রই প্রশ্নফাঁসের ইস্যু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। এই উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যেই অভিজিৎ দীপকে-র নেতৃত্বে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP) নামক একটি নতুন রাজনৈতিক মঞ্চের আত্মপ্রকাশ ঘটে, যা দিল্লির যন্তর-মন্তরের ছাত্র আন্দোলনকে সরাসরি সমর্থন জানিয়ে সামনের সারিতে চলে আসে। বিরোধীরাও একজোট হয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার হয়।

৩. দিল্লির রাজপথে সংঘাত ও বিক্ষোভ

এই দেশজোড়া ছাত্র আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল রাজধানী দিল্লি। প্রতিবাদী শিক্ষার্থীরা সংসদ অভিমুখে বিশাল মিছিল করে, যা বিপুল সংখ্যক তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করে। তবে এই আন্দোলন চলাকালীন একাধিকবার পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। কনট প্লেস ও সংলগ্ন এলাকায় চলা বিক্ষোভে সহিংসতার অভিযোগ তোলে দিল্লি পুলিশ। প্রশাসনের দাবি, নিরাপত্তা কর্মীদের লক্ষ্য করে ইট ও জলের বোতল ছোঁড়া হয়েছিল এবং পুলিশ অফিসারদের সুনির্দিষ্টভাবে নিশানা করা হচ্ছিল।

৪. সোনম ওয়াংচুকের এন্ট্রি ও অনশন

আন্দোলনের তেজ বাড়াতে লাদাখের প্রখ্যাত পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক গত ২৮ জুন সরাসরি যন্তর-মন্তরে ছাত্র বিক্ষোভে যোগ দেন এবং অনশনে বসে যান। একটানা দীর্ঘ দিন অনশন চালানোর ফলে তাঁর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। পরীক্ষার ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার এবং বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে যেন কোনও পুলিশি দমনপীড়ন বা মামলা না চালানো হয়—এই সমস্ত দাবি জোরালো করে তোলেন তিনি।

৫. দেশজোড়া বিক্ষোভ এবং ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ

দিল্লির পাশাপাশি বিহারের বিভিন্ন জেলা, কলকাতা, লখনউ, ভোপাল, হায়দ্রাবাদ থেকে শুরু করে চেন্নাই পর্যন্ত—দেশের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে পড়ে এই ছাত্র বিক্ষোভ। একদিকে দেশব্যাপী তীব্র অসন্তোষ এবং অন্যদিকে চরম রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত মোদী মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান

বিরোধী দলগুলি একযোগে একে ছাত্রদের ঐতিহাসিক বিজয় বলে ঘোষণা করে। আর এই পদত্যাগের পরেই CJP এবং আন্দোলনকারীরা যন্তর-মন্তরে তাদের টানা আন্দোলনের সমাপ্তি ঘোষণা করে। মাত্র ৭০ দিনের এই রাজনৈতিক ডামাডোল ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে এক স্থায়ী ছাপ রেখে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *