হঠাৎ ওজন বৃদ্ধি বা চুল পড়া? অবহেলা করলেই বড় বিপদ, শরীরে বাসা বাঁধছে না তো এই ‘সাইলেন্ট’ রোগ?

পর্যাপ্ত ঘুম ও সুষম খাবার খাওয়ার পরেও যদি হঠাৎ ওজন বেড়ে বা কমে যায়, সারাক্ষণ ক্লান্তি ঘিরে ধরে, চুল পড়তে থাকে কিংবা অকারণে মন খারাপ থাকে—তাহলে এগুলোকে সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। এই লক্ষণগুলোর পেছনে মূলত দায়ী থাকতে পারে গলার ছোট একটি গ্রন্থি, যার নাম ‘থাইরয়েড’ (Thyroid)।

বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ থাইরয়েডজনিত সমস্যায় ভুগছেন এবং পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই বেশি। তবে সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত হলে এবং নিয়মিত চিকিৎসা করালে এটি সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

১. থাইরয়েড আসলে কী এবং এর কাজ কী?
গলার সামনের দিকে প্রজাপতির আকৃতির ছোট একটি গ্রন্থি হলো থাইরয়েড। এটি মূলত দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমোন তৈরি করে— থাইরক্সিন (T4) এবং ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন (T3)। এই হরমোনগুলো শরীরের বিপাকক্রিয়া (Metabolism), হৃদ্‌স্পন্দন, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, শক্তি উৎপাদন এবং বিভিন্ন অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রমে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হরমোনের উৎপাদনে সামান্য তারতম্য হলেই শরীরে দেখা দেয় নানা জটিলতা।

২. থাইরয়েড সমস্যার ধরন ও লক্ষণসমূহ
থাইরয়েডের সমস্যা সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে এবং উভয়ের উপসর্গগুলো একে অপরের থেকে একেবারেই আলাদা:

ক) হাইপোথাইরয়েডিজম (যখন হরমোন কম উৎপন্ন হয়):
সব সময় অতিরিক্ত ক্লান্তি ও অবসাদ।

কোনো কারণ ছাড়াই ওজন বৃদ্ধি পাওয়া।

অতিরিক্ত ঠান্ডা লাগা ও কোষ্ঠকাঠিন্য।

ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া এবং চুল পড়া বা চুল পাতলা হয়ে যাওয়া।

মুখ ও শরীরে ফোলাভাব।

মনোযোগ কমে যাওয়া, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া ও বিষণ্নতা।

হৃদ্‌স্পন্দন ধীর হয়ে যাওয়া এবং নারীদের অনিয়মিত বা অতিরিক্ত মাসিক।

খ) হাইপারথাইরয়েডিজম (যখন হরমোন অতিরিক্ত উৎপন্ন হয়):
খুব দ্রুত ওজন হ্রাস পাওয়া।

হৃদ্‌স্পন্দন বেড়ে যাওয়া বা বুক ধড়ফড় করা।

অতিরিক্ত ঘাম হওয়া এবং গরম সহ্য করতে না পারা।

হাত কাঁপা, অস্থিরতা বা তীব্র উদ্বেগ।

ঘুমের সমস্যা ও ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া।

ঘন ঘন পায়খানা হওয়া ও পেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া।

কিছু ক্ষেত্রে চোখ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বাইরে বেরিয়ে আসা (গ্রেভস ডিজিজ)।

৩. যে লক্ষণগুলো ভুলেও অবহেলা করা উচিত নয়
অকারণে ওজনের বড় ধরনের পরিবর্তন।

দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ক্লান্তি।

হৃদ্‌স্পন্দনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন।

গলার সামনে ফোলা ভাব বা কোনো গিঁট অনুভব হওয়া।

দীর্ঘমেয়াদী চুল পড়া ও মাসিক চক্রে পরিবর্তন।

সন্তান ধারণে সমস্যা বা বন্ধ্যাত্ব।

৪. কাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি?
নারী ও ৬০ বছরের বেশি বয়সি ব্যক্তিরা।

পরিবারে বা বংশে থাইরয়েড রোগের ইতিহাস থাকলে।

অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা।

গর্ভাবস্থায় বা সন্তান জন্মের পর কিছু নারী।

অতীতে ঘাড়ে রেডিয়েশন থেরাপি নেওয়া ব্যক্তিরা।

৫. রোগ নির্ণয় ও আধুনিক চিকিৎসা
শুধুমাত্র বাহ্যিক উপসর্গ দেখে থাইরয়েড রোগ নিশ্চিত করা যায় না। এর জন্য চিকিৎসকরা কিছু রক্ত পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন, যেমন— TSH, Free T4, Free T3, থাইরয়েড অ্যান্টিবডি পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে থাইরয়েড আলট্রাসনোগ্রাম।

চিকিৎসা পদ্ধতি: রোগের ধরন অনুযায়ী এর চিকিৎসা ভিন্ন হয়। হাইপোথাইরয়েডিজমে সাধারণত হরমোন প্রতিস্থাপনের ওষুধ (যেমন- লেভোথাইরক্সিন) দেওয়া হয়। অন্যদিকে, হাইপারথাইরয়েডিজমে ওষুধ, রেডিওঅ্যাকটিভ আয়োডিন থেরাপি বা বিশেষ ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। (সতর্কতা: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনোই নিজে থেকে থাইরয়েডের ওষুধ শুরু বা বন্ধ করা উচিত নয়।)

৬. থাইরয়েড সুস্থ রাখতে করণীয়
সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করুন।

রান্নায় পরিমিত পরিমাণ আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করুন।

নিয়মিত হালকা শরীরচর্চা ও পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ফলোআপ ও পরীক্ষা করান।

থাইরয়েডের সমস্যা অনেক সময় নীরবে শুরু হয় এবং সাধারণ ক্লান্তি বা মানসিক চাপের সঙ্গে মিলে যাওয়ার কারণে সহজেই চোখ এড়িয়ে যায়। তাই দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *