মাথার ভেতরে টাইম বোমা! এই লক্ষণগুলো দেখা দিলেই হতে পারে মারাত্মক ব্রেন স্ট্রোক

মাথার ভেতরে থাকা রক্তনালীর দেওয়াল দুর্বল হয়ে বেলুনের মতো ফুলে যাওয়াকে ব্রেন অ্যানিউরিজম (Brain Aneurysm) বলা হয়। এটি বছরের পর বছর নীরবে শরীরে অবস্থান করতে পারে, কিন্তু ফেটে গেলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ শুরু হয় যা স্ট্রোকের এক অত্যন্ত বিপজ্জনক রূপ এবং এর পরিণতি হতে পারে মারাত্মক।
দিল্লির সিকে বিড়লা হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের ডিরেক্টর ডা. কে কে জিন্দল জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ প্রকাশ পায় না বলে বেশিরভাগ মানুষই জানেন না যে তারা এই প্রাণঘাতী সমস্যায় ভুগছেন। এই কারণেই এটিকে ‘সাইলেন্ট কিলার’ বা নীরব ঘাতক বলা হয়। তবে অ্যানিউরিজম আকারে বড় হলে বা আশেপাশের স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করলে কিছু বিশেষ উপসর্গ দেখা দেয়।
১. অ্যানিউরিজম না ফাটলে যে লক্ষণগুলো দেখা দেয়:
মাথার যেকোনো একপাশে একটানা ও তীব্র ব্যথা।
চোখের পেছন দিকে বা ওপরের অংশে ব্যথা।
দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে যাওয়া বা একটি জিনিস দুটি দেখা (Double Vision)।
চোখের একটি পাতা নিচে ঝুলে পড়া।
মুখের যেকোনো একপাশে অবশ ভাব বা দুর্বলতা।
চোখের মণির আকার স্বাভাবিকের চেয়ে বড় হয়ে যাওয়া।
২. অ্যানিউরিজম ফটে গেলে জরুরি লক্ষণ (Medical Emergency):
যদি অ্যানিউরিজম ফেটে যায়, তবে তা জীবন সংশয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই লক্ষণগুলো দেখলে মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে:
তীব্র ও হঠাৎ মাথা ব্যথা: যা জীবনে কখনো অনুভূত হয়নি।
বমি বমি ভাব বা ঘন ঘন বমি হওয়া।
ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া।
অতিরিক্ত আলো বা উজ্জ্বল আলোতে অস্বস্তি।
মানসিক বিভ্রান্তি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা চেতনা হ্রাস পাওয়া।
খিঁচুনি আসা।
শরীরের কোনো অংশে হঠাৎ দুর্বলতা বা কথা বলতে সমস্যা হওয়া।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রতি মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান। সামান্য দেরিতেও মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি বা রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
৩. কাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি?
উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাড প্রেশারের রোগীরা।
যারা নিয়মিত ধূমপান করেন।
অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনকারীরা।
পরিবারে বা বংশে কারো ব্রেন অ্যানিউরিজমের ইতিহাস থাকলে।
পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ বা নির্দিষ্ট কিছু জন্মগত রোগে আক্রান্তরা।
৪০ বছরের বেশি বয়সী মহিলারা।
৪. রোগ নির্ণয় ও আধুনিক চিকিৎসা
ব্রেন অ্যানিউরিজম শনাক্ত করতে চিকিৎসকরা সাধারণত সিটি স্ক্যান (CT Scan), সিটি এনজিওগ্রাফি (CTA), এমআর এনজিওগ্রাফি (MRA) অথবা ডিজিটাল সাবট্র্যাকশন এনজিওগ্রাফি (DSA)-এর মতো উন্নত পরীক্ষাগুলো করে থাকেন।
রোগীর অ্যানিউরিজমের আকার, অবস্থান এবং তা ফেটে যাওয়ার ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা নির্ধারিত হয়। বর্তমানে এর চিকিৎসায় মাইক্রোসার্জিক্যাল ক্লিপিং (Microsurgical Clipping), এন্ডোভাসকুলার কয়েলিং (Endovascular Coiling) কিংবা ফ্লো-ডাইভার্টার (Flow-diverter)-এর মতো আধুনিক প্রযুক্তি সফলভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
৫. প্রতিরোধের উপায়
সব ব্রেন অ্যানিউরিজম প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও এর ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা যায়:
নিয়মিত রক্তচাপ বা ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
আজই ধূমপান সম্পূর্ণ বর্জন করুন।
মদ্যপানের মাত্রা সীমিত করুন।
সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম করুন।
পরিবারে এই রোগের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নিয়মিত স্ক্রিনিং ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান।