“এভাবে চলতে দেওয়া যায় না!” নিট প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে কেন্দ্রকে সুপ্রিম কোর্টের কড়া নির্দেশ

পরীক্ষায় ধারাবাহিক অনিয়ম ও প্রশ্নফাঁসের মতো গুরুতর ঘটনার অবসান ঘটানোর জন্য এবার সরাসরি কেন্দ্রকে কঠোর নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। শুক্রবার NEET বা নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত মামলার গুরুত্বপূর্ণ শুনানিকালে শীর্ষ আদালত সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, সরকার যেন অবিলম্বে এই ধরনের “ধারাবাহিক ত্রুটি-বিচ্যুতি”র চিরতরে অবসান ঘটায়। বিচারপতি পি এস নরসিমা এবং বিচারপতি অলোক আরাধের সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ বেঞ্চ কেন্দ্রকে স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দিয়েছে যে, আদালত এই সমগ্র বিষয়টি অত্যন্ত “নিবিড়ভাবে” পর্যবেক্ষণ করবে এবং নিয়মিতভাবে এর অগ্রগতির সমস্ত দিক খতিয়ে দেখবে।

প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর জোর ও আদালতের প্রশ্ন:
শুনানিকালে সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতির বেঞ্চ অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেছে, “আমরা যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করব যেন গোটা পরীক্ষা ব্যবস্থা একটি সুনির্দিষ্ট এবং কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতার মধ্যে নিয়ে আসা হয়।”

এর পাশাপাশি শীর্ষ আদালতের পক্ষ থেকে কেন্দ্রের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন রাখা হয়। আদালত জানতে চায় যে, সম্পূর্ণভাবে কম্পিউটার-ভিত্তিক বা অনলাইন পদ্ধতিতে (Computer-Based Test) ভবিষ্যতের পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা চালুর ক্ষেত্রে কেন্দ্র ঠিক কী কী সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করছে? আদালতের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়, “যখন আপনারা সম্পূর্ণ অনলাইন বা কম্পিউটার-ভিত্তিক পরীক্ষার পদ্ধতি চালু করবেন, তখন পরীক্ষার্থীদের গোপনীয়তা এবং তথ্যের সম্পূর্ণ সুরক্ষা আপনারা কীভাবে নিশ্চিত করবেন—তা দয়া করে আদালতকে সবিস্তারে জানান।”

আদালতের এই সমস্ত প্রশ্নের জবাবে ভারতের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা (যিনি কেন্দ্রের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করছেন) আদালতকে জানান যে, পরীক্ষার্থীদের বর্তমান সমস্ত সমস্যা ও উদ্বেগ দূর করতে সরকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একইসঙ্গে তিনি আদালতের কাছে পুরো বিষয়টির একটি “সামগ্রিক চিত্র” বা পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরার জন্য আরও কিছুটা সময় প্রার্থনা করেন। তবে কেন্দ্রের এই আর্জি শোনার পর সুপ্রিম কোর্ট দ্ব্যর্থহীন ভাষায় মন্তব্য করেছে, “আমরা এই স্পর্শকাতর বিষয়টিকে এভাবেই চলতে দিতে পারি না।” এরপর আদালত আগামী ৩ আগস্ট এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছে।

বিক্ষোভ ও আইনি সংস্কারের প্রেক্ষাপট:
উল্লেখ্য, নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুরুতর অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশটির কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র নেতৃত্বে রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র ছাত্র বিক্ষোভ চলছে। আর এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই সুপ্রিম কোর্টের এই কড়া পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক ও আইনি মহল। চলতি সপ্তাহের শুরুতেই দিল্লির রাজপথে দফায় দফায় ব্যাপক হিংসা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সিজেপি-র পূর্বঘোষিত ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে যখন হাজার হাজার বিক্ষোভকারী সংসদ ভবনের দিকে মিছিল করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তখনই আন্দোলনকারী ও দিল্লি পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ এবং বেধড়ক লাঠিচার্জ করে।

অন্যদিকে, এই সংঘাতে পুলিশের বিরুদ্ধে চরম দমন-পীড়নের মারাত্মক অভিযোগ তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। যদিও পাল্টা পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তারা যথেষ্ট সংযম বজায় রেখেই পরিস্থিতি সামলেছেন এবং কেবল আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থেই এই কঠোর পদক্ষেপ করা আবশ্যক ছিল।

এদিকে, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে গত ২৮ জুন থেকে একটানা অনশন চালিয়ে যাচ্ছিলেন প্রখ্যাত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। গত ১৮ জুলাই হঠাৎই তাঁর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটায় চিকিৎসকদের জরুরি পরামর্শে তাঁকে বিক্ষোভস্থল থেকে সরাসরি সাফদরজং হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। তবে সরকারি ওই হাসপাতালে চিকিৎসার ক্ষেত্রে চরম গাফিলতির অভিযোগ তুলে তাঁর স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো দ্রুত দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। হাইকোর্টে টানা দু’দিন শুনানির পর আদালত তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য গুরুগ্রামের মেদান্তা হাসপাতালে স্থানান্তরের অনুমতি দেয়, যেখানে অবশেষে আজ তিনি তাঁর দীর্ঘ অনশন আনুষ্ঠানিকভাবে ভঙ্গ করেন।

প্রশ্নফাঁস রুখতে আরও কঠোর হচ্ছে আইন:
সূত্রের মারফত জানা গিয়েছে, দেশজুড়ে প্রশ্নফাঁস এবং পরীক্ষার নামে যেকোনো ধরনের জালিয়াতি চিরতরে বন্ধ করতে বিদ্যমান আইনগুলোকে আরও অনেক বেশি কঠোর করার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করছে কেন্দ্রীয় সরকার। বিশ্বস্ত সূত্রে খবর মিলেছে যে, সরকার খুব শীঘ্রই ‘পাবলিক এক্সামিনেশনস (প্রিভেনশন অফ আনফেয়ার মিনস) অ্যাক্ট, ২০২৪’-এর নিয়মনীতিতে বড় ধরনের সংশোধনী আনার জোরালো পরিকল্পনা নিয়েছে এবং আজকের মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সংশোধনী অনুমোদিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই নতুন সংশোধিত আইনে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত মামলাগুলি অত্যন্ত দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য বিশেষ ‘ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত’ গঠনের আইনি বিধান যুক্ত করা হতে পারে। পাশাপাশি, প্রশ্নফাঁসের মতো ঘৃণ্য ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের জন্য জেলের মেয়াদ তথা কারাদণ্ড এবং জরিমানার আর্থিক অঙ্কও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেওয়ার কথা ভাবছে কেন্দ্র।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *