হরমুজ প্রণালীতে আটকে হাজারো জাহাজ! বাণিজ্য পুনরায় শুরু হতেই বিশ্বজুড়ে বড়সড় সামুদ্রিক বিপদের আশঙ্কা

আমেরিকা ও ইরানের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জেরে বিশ্ব বাণিজ্যে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন সংকট। গত ছ’মাস ধরে হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) সম্পূর্ণ অচল থাকায় সৌদি আরব, ইরান, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো তেল উৎপাদনকারী দেশগুলির উন্মুক্ত সমুদ্রে যাতায়াতের একমাত্র পথটি বন্ধ রয়েছে। এর ফলে পারস্য উপসাগরে আটকে পড়েছে প্রায় ১,৫০০টি বাণিজ্যিক জাহাজ। আর এই দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতাই ডেকে আনছে এক নতুন ও মারাত্মক পরিবেশগত বিপর্যয়।

সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের একটি আন্তর্জাতিক দল জানিয়েছে, এই জাহাজগুলি চলাচল শুরু করলেই বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক আক্রমণাত্মক (Invasive) প্রজাতির এক ভয়ংকর ‘সুপার-স্প্রেডার’ সংকট তৈরি হতে পারে।

কী এই সামুদ্রিক ‘সুপার-স্প্রেডার’ সংকট?
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান পত্রিকা Biological Invasions-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় অংশ নিয়েছিলেন ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স (UMCES) এবং উডস হোল ওশানোগ্রাফিক ইনস্টিটিউশন (WHOI)-সহ ২৪ জন শীর্ষস্থানীয় সামুদ্রিক বিজ্ঞানী।

গবেষকদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় আরব উপসাগরে দীর্ঘদিন ধরে নোঙর করে থাকা হাজার হাজার বাণিজ্যিক জাহাজের হালের (Hull) গায়ে অজান্তেই জন্ম নিয়েছে নানা সামুদ্রিক জীবের উপনিবেশ। সামুদ্রিক শিল্পে এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় বায়োফাউলিং (Biofouling)। এর ফলে জাহাজের জলে নিমজ্জিত অংশে প্রথমে অণুজীব ও আঠালো স্তর (Slime) তৈরি হয়। পরবর্তীতে তার ওপরে শৈবাল (Algae), বার্নাকল (Barnacles), মাশেল (Mussels) এবং বিভিন্ন অমেরুদণ্ডী সামুদ্রিক প্রাণী বাসা বাঁধতে শুরু করে।

উডস হোল ওশানোগ্রাফিক ইনস্টিটিউশনের জীববিজ্ঞানী ক্যারোলিন টেপোল্ট জানিয়েছেন, এই জীবগুলি নতুন পরিবেশের সঙ্গে অত্যন্ত দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে। একবার এরা অন্য কোনো নতুন উপকূলে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তুললে তাদের সম্পূর্ণ নির্মূল করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত প্রভাব
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (IMO)-র নিয়ম অনুযায়ী, ৩০ দিনের বেশি অচল থাকা কোনো জাহাজ যাত্রা শুরুর আগে বায়োফাউলিং পরিষ্কার করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই জাহাজগুলি সামুদ্রিক জীবের দ্রুত বৃদ্ধির মৌসুমে প্রায় চার মাস ধরে সমুদ্রে আটকে রয়েছে।

আইএমও (IMO)-র রিপোর্ট বলছে, জাহাজের গায়ে সামান্য বার্নাকল বা শৈবাল জমলে অতিরিক্ত প্রতিরোধের (Drag) কারণে জ্বালানি ব্যবহার এবং কার্বন নির্গমন ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ‘এশিয়ান গ্রিন মাশেল’ (Asian Green Mussel)। ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এই আক্রমণাত্মক প্রজাতিটি আরব উপসাগর হয়ে ইতিমধ্যেই ক্যারিবিয়ান সাগর ও দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয় সামুদ্রিক জীবকূলকে ধ্বংস করছে।

সংকট থেকে মুক্তির উপায় কী?
বিজ্ঞানীদের জোরালো দাবি, জাহাজগুলি পুনরায় চলাফেরা শুরু করার আগে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও শিপিং অপারেটরদের কঠোরভাবে বায়োফাউলিং পরিষ্কারের ব্যবস্থা করতে হবে। যাত্রা শুরুর আগে জলের নিচেই জাহাজের হাল ও প্রপেলার পরিষ্কার করার কাজটি এই বিপদ এড়াতে সবচেয়ে কার্যকর।

সাম্প্রতিক খবর অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন বন্দরে জাহাজ চলাচলের তোড়জোড় শুরু হওয়ার আগেই ডুবুরিদের দিয়ে জাহাজের তলা পরিষ্কার করানোর কাজ চলছে। তবে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় এই কাজ করায় প্রতি জাহাজ পিছু পরিষ্কারের খরচ প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গিয়ে ৮,০০০ মার্কিন ডলারে ঠেকেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের চাকা সচল রাখতে গিয়ে সামুদ্রিক পরিবেশ কতটা সুরক্ষিত রাখা যায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *