বোট ক্লাব থেকে যন্তর মন্তর! দিল্লির কোন ঐতিহাসিক নির্দেশে প্রতিবাদের চেনা মানচিত্র বদলে গেল চিরতরে?

দিল্লিতে বড় কোনও আন্দোলন বা বিক্ষোভের কথা উঠলেই সবার আগে যে নামটি সামনে আসে, তা হলো ‘যন্তর মন্তর’ (Jantar Mantar)। সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন কিংবা কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক এলাকার মতো ভিআইপি জোন বাদ দিয়ে কেন ঠিক এই নির্দিষ্ট স্থানটিকেই প্রতিবাদের জন্য বেছে নেওয়া হয়—সম্প্রতি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP Protest)-র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এই প্রশ্নটি ফের জোরালো হয়েছে।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় প্রায় চার দশক আগের এক ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে।
বোট ক্লাব থেকে যন্তর মন্তর: প্রতিবাদের মানচিত্র বদলের ইতিহাস
১৯৮৮ সালে বিখ্যাত কৃষক নেতা মহেন্দ্র সিং টিকায়েতের নেতৃত্বে দিল্লির বোট ক্লাবে লক্ষাধিক কৃষকের এক বিশাল মহাসমাবেশ হয়েছিল। ইন্ডিয়া গেট সংলগ্ন সেই রাজনৈতিক আন্দোলন ও অবস্থান বিক্ষোভে কয়েকদিনের জন্য কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল গোটা এলাকা, যার ফলে প্রশাসনিক মহলে তীব্র চাপ তৈরি হয়।
এই ঘটনার পরেই নড়েচড়ে বসে সরকার ও প্রশাসন। পরবর্তীতে আদালতের হস্তক্ষেপে ১৯৯৩ সালে বোট ক্লাবে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক আন্দোলন ও জমায়েত আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। এর বিকল্প হিসেবেই বিক্ষোভ প্রদর্শনের জন্য বেছে নেওয়া হয় ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর সংলগ্ন রাস্তাকে। ধীরে ধীরে এটি দেশের সবচেয়ে পরিচিত এবং প্রধান প্রতিবাদস্থলে পরিণত হয়।
আদালতের সুরক্ষা ও নাগরিক অধিকার
২০১৮ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রায়ে যন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও আন্দোলন করাকে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিল যে, একটি সুস্থ গণতন্ত্রে সরকারের নীতি বা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মত প্রকাশের সুযোগ থাকা অত্যন্ত জরুরি। তবে একই সঙ্গে আদালতের নির্দেশ ছিল, এই অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জনজীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাও সমানভাবে আবশ্যিক।
কেন বেছে নেওয়া হয় এই নির্দিষ্ট জায়গাই?
দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও যন্তর মন্তরের বিশেষ কিছু ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক সুবিধা রয়েছে:
নিরাপদ দূরত্ব: এটি সংসদ ভবন ও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকে কিছুটা দূরত্বে অবস্থিত। এর ফলে বিক্ষোভকারীদের কণ্ঠ বা দাবি সংবাদমাধ্যম ও জনসাধারণের নজরে যেমন সহজেই আসে, তেমনই সরাসরি দেশের শীর্ষ প্রশাসনিক কাজকর্মে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা থাকে না।
মৌলিক সুযোগ-সুবিধা: এই নির্দিষ্ট এলাকায় নির্দিষ্ট কিছু শর্তসাপেক্ষে আন্দোলনের অনুমতি দেওয়া হয়। এছাড়া এখানে পানীয় জল, শৌচাগার এবং অস্থায়ী মঞ্চ তৈরির ন্যূনতম সুবিধা থাকায় দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান বা অনশন কর্মসূচি পরিচালনা করা আন্দোলনকারীদের জন্য সহজ হয়।
আইনি কড়াকড়ি: যন্তর মন্তরের বাইরে, বিশেষ করে সংসদমুখী এলাকায় বিএনএস (BNS) ১৬৩ ধারা অনুযায়ী জমায়েতের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ জারি থাকে। ফলে অনুমতি ছাড়া কোনও মিছিল বা জমায়েত ওই এলাকার দিকে এগোতে চাইলে পুলিশি বাধার মুখে পড়তে হয়।
প্রতিবাদের মাটি নাকি প্রশাসনিক কৌশল?
সমালোচকদের মতে, যন্তর মন্তর একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের এক ঐতিহাসিক ও উন্মুক্ত মাটি, তেমনই অন্যদিকে এটি বৃহত্তর আন্দোলনগুলোকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখার এক ধরনের প্রশাসনিক কৌশলও বটে। তা সত্ত্বেও, দিল্লির বুকে নাগরিক অধিকার এবং প্রতিবাদের সবচেয়ে স্বীকৃত ও শক্তিশালী মঞ্চ হিসেবে যন্তর মন্তরের গুরুত্ব আজও অপরিসীম।