কলেজ স্ট্রিটে বিশাল মেকওভারের মাস্টারপ্ল্যান! বইপাড়াকে কোন বিশ্বমানের রূপ দিতে সাতসকালে ময়দানে নামলেন মন্ত্রী?

হকার বা দোকানদারদের উচ্ছেদ নয়, বরং ঐতিহ্যবাহী কলেজ স্ট্রিটকে ঢেলে সাজানোর ঐতিহাসিক পরিকল্পনা নিল রাজ্য সরকার। আগেই কলেজ স্ট্রিটের সম্পূর্ণ ‘মেক ওভার’-এর কথা ঘোষণা করেছিলেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। আর সেই পরিকল্পনাকে এবার বাস্তবে রূপ দিতে বুধবার একেবারে সাতসকালে সশরীরে বইপাড়ায় উপস্থিত হলেন মন্ত্রী। সঙ্গে ছিলেন কলকাতা পৌরনিগমের পুর কমিশনার স্মিতা পাণ্ডে এবং শীর্ষস্থানীয় আধিকারিকরা। এদিন সকালে কলেজ স্ট্রিট চত্বরের অলিগলি ঘুরে দেখেন এবং স্থানীয় পথচারী ও বই বিক্রেতাদের সঙ্গেও কথা বলেন তিনি।
কীভাবে সেজে উঠবে নতুন কলেজ স্ট্রিট?
এলাকা পরিদর্শনের সময়ই আধিকারিকদের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কলেজ স্ট্রিটকে সাজিয়ে তোলার ব্লু-প্রিন্ট নিয়ে আলোচনা করেন মন্ত্রী। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, কলেজ স্ট্রিটের একটি বিশেষ অংশকে সম্পূর্ণ ‘নো ভেহিকেলস জোন’ বা গাড়ি নিষিদ্ধ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হবে। সেখানে কোনো চারচাকা বা দুমদাম হর্ন বাজিয়ে গাড়ি চলবে না। নির্দিষ্ট ওই অঞ্চলে শুধুমাত্র বইয়ের দোকানগুলিকেই সুশৃঙ্খলভাবে রিলোকেট করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে মূল কলেজ স্ট্রিটের ব্যস্ত রাস্তায় এখনই কোনো পরিবর্তন করা হচ্ছে না।
বইপাড়ার অন্দরে যাতায়াতের ব্যবস্থার কথা বলতে গিয়ে অগ্নিমিত্রা জানান, “বাইরে থেকে কেউ সাইকেল নিয়ে আসবেন না। এখান থেকেই সবাই সাইকেল নেবেন এবং সেই সাইকেলে চড়েই পুরো চত্বর ঘুরে দেখতে পারবেন বইপ্রেমীরা। আর যিনি হাঁটতে ভালোবাসেন, তিনি হেঁটে বেড়াবেন। পাশাপাশি, বয়স্ক ও প্রবীণ নাগরিকদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য বিশেষ ব্যাটারি চালিত গাড়ি বা কারের ব্যবস্থাও থাকবে।”
রাজ্যের আসল পরিকল্পনা কী?
টিভি৯ বাংলাকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে কলেজ স্ট্রিট নিয়ে রাজ্যের দূরদর্শিতার কথা স্পষ্ট করে জানান পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী। তিনি বলেন, “কলেজ স্ট্রিট মানেই চিরকালের বইপাড়া। এখানে সুনির্দিষ্টভাবে শুধু বইয়ের দোকান, খাতা-পেনসিল ও নোট-প্যাডের দোকানই থাকবে। এলাকাটিকে ‘নো ভেহিকেলস জোন’ করা হবে যাতে কোনো কোলাহল না থাকে। সেখানে শুধু সাইকেল চলবে এবং বয়স্কদের জন্য থাকবে ব্যাটারি কার। মনোরম পরিবেশ বজায় রাখতে থাকবে আধুনিক ক্যাফে এবং বই পড়ার জন্য সুন্দর সুন্দর বঞ্চ। তবে মেন কলেজ স্ট্রিটকে আপাতত আমরা হাত দিচ্ছি না, কারণ ওটা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ট্র্যাফিক জোন। এখানকার ঐতিহ্যবাহী রেলিংটাকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে চাই, আর সেজন্যই রাস্তার ধারের কিছু দোকানকে যদি সুনির্দিষ্ট জায়গায় রিলোকেট করা যায়, সেই সমস্ত দিক খতিয়ে দেখেই এবার কাজ শুরু হবে।”
দোকানদারদের রুটিরুজি ও পুনর্বাসন নিয়ে কী বললেন মন্ত্রী?
দোকান উচ্ছেদ বা ব্যবসায়ীদের রুটিরুজির উপর কোনো প্রভাব পড়বে কি না—এই প্রশ্ন উঠতেই মন্ত্রী জোরালো আশ্বাসের সুরে জানান, “এই রাস্তার উপর তো বই বা স্টেশনারি ছাড়া অন্য কোনো অবৈধ দোকান নেই। আর যাঁদের আসল বইয়ের দোকান রয়েছে, তাঁদেরই আমরা অন্য কোথাও সুনির্দিষ্টভাবে রিলোকেট করব। তাঁদের সুবিধার জন্যই একই রকম আধুনিক ডিজাইনের সুন্দর স্টল তৈরি করে দেওয়া হবে। বর্তমানে যেমন ইচ্ছেমতো কেউ ডার্ক ব্লু টিন, কেউ আবার লাল টিন দিয়ে দোকান বানান, সেই বিশৃঙ্খলা আমরা আর রাখতে চাইছি না। বিদেশের সুদৃশ্য রাস্তার আদলে পুরো এলাকাটিকে সাজিয়ে তোলা হবে।”
কী বলছেন স্থানীয় বই বিক্রেতারা?
সরকারের এই নতুন রূপায়ন পরিকল্পনা ও মেকওভারের উদ্যোগকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও আশার আলো দেখছেন বইপাড়ার ব্যবসায়ীরাও। এক প্রবীণ বই বিক্রেতা বলেন, “মন্ত্রী নিজে এসে সবটা দেখেছেন এবং ভালোভাবে সাজাবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। সবার কাছে মতও চাইছেন। আমাদের বলা হয়েছে দোকানগুলো তোলা হবে না, বরং নতুন রূপ দিয়ে সাজানো হবে। আমরা চাইছি সবকিছু সুন্দর হোক।” তবে অন্য এক বিক্রেতার কথায় উঠে এসেছে সাবধানী সুর, “শহর সুন্দর হোক, এটা আমরাও চাই। কিন্তু আমাদের পেটে যেন কোনোভাবেই লাথি না পড়ে, সেদিকেও প্রশাসনের নজর রাখা উচিত।”