‘এসব শুনতেও লজ্জা লাগে”-নতুন BJP-দের ‘দাদাগিরি’ শুরু? নানা এলাকা থেকে আসছে অভিযোগ

রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পূর্ব বর্ধমানের একাধিক এলাকায় নব্য বিজেপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মাত্রাতিরিক্ত দাদাগিরি ও জুলুমবাজির অভিযোগ উঠছে। তৃণমূল কংগ্রেসের জোরালো দাবি, পারিবারিক বিবাদ থেকে শুরু করে জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধ—সবক্ষেত্রেই নিজেদের ‘বিচারক’ সাজিয়ে অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন সদ্য দলবদল করা কিছু বিজেপি কর্মী-নেতা। কোথাও সাধারণ মানুষকে জরিমানা করা হচ্ছে, আবার কোথাও জোর করে চাষবাস বন্ধ করে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও সামনে এসেছে।

ঠিক কী অভিযোগ উঠছে নব্য বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে?

তৃণমূলের অভিযোগ অনুযায়ী, পূর্ব বর্ধমানের রায়না-২ ব্লকের এক নেতার পুকুর থেকে সম্প্রতি জোর করে মাছ ধরে নিয়ে গিয়েছে নব্য বিজেপি কর্মীরা। শুধু তাই নয়, ওই নেতার কৃষিকাজও জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে বর্ধমান-১ ব্লকেও একাধিক তৃণমূল নেতাকে অন্যায়ভাবে জরিমানা করার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি রাজনৈতিক কারণে যাঁদের এলাকা ছেড়ে বাইরে থাকতে হচ্ছে, তাঁদেরও মোটা অঙ্কের জরিমানা মিটিয়ে তবেই এলাকায় ফেরার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি শাসক শিবিরের।

রায়নার এক স্থানীয় তৃণমূল নেতার কথায়, “যাঁরা অতীতে সিপিএমের সাইনবোর্ড নিয়ে দাদাগিরি করতেন, তাঁরাই রাতারাতি বিজেপিতে নাম লিখিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের পুরনো অত্যাচার করার স্বভাব বদলায়নি। দেশের আইন বা আদালত বিচার করার জন্য রয়েছে, কিন্তু এঁরা নিজেরাই বিচারকের আসন দখল করে বসেছেন।” জামালপুরেও একই ছবি দেখা গেছে। এক নেতার বাড়ির শৌচালয় সংস্কারের কাজে বাধা দেওয়া এবং কথা না মানায় হেনস্থা করতে পুলিশ পাঠানোর মতো চাঞ্চল্যকর অভিযোগও উঠেছে।

অস্বস্তিতে দলের প্রবীণ নেতৃত্ব ও বিজেপির প্রতিক্রিয়া

দলবদলুদের এমন বেপরোয়া আচরণে তীব্র অসন্তোষ ও অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন বিজেপিরই একাংশ প্রবীণ ও পুরনো নেতৃত্ব। তাঁদের সাফ কথা, যাঁরা বছরের পর বছর ধরে ঘাম ঝরিয়ে দলের সংগঠন তৈরি করেছেন, এই ধরনের নব্য ও সুযোগসন্ধানী নেতারা তাঁদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে তৈরি ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রবীণ বিজেপি নেতা আক্ষেপ করে জানান, “এসব ঘটনা শুনতে পর্যন্ত লজ্জা লাগে। এত বছর ধরে রাজনীতি করছি, আমাদের বিরুদ্ধে কখনও এমন তোলাবাজি বা জুলুমের অভিযোগ ওঠেনি।”

পুরো পরিস্থিতি নিয়ে গলসির বিজেপি বিধায়ক রাজু পাত্র সংবাদমাধ্যমকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কাউকেই দেওয়া হয়নি। তাঁর দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা, “যাঁরা অন্যায় করবেন, তাঁদের অপরাধের দায় দল নেবে না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে পুলিশ প্রশাসন আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেবে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। অন্য দল থেকে এসে যদি কেউ সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার চালান, তাঁদের বিরুদ্ধেও দলীয় ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

রাজনৈতিক তরজা ও অন্দরের উদ্বেগ

এই ইস্যুতে বিজেপিকে নিশানা করে তৃণমূল নেতা দেবু টুডু অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই সাধারণ মানুষ ও তৃণমূল কর্মীদের ওপর এই ধরনের অত্যাচার চালানো হচ্ছে। তাঁর মতে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তৃণমূল করা কোনও অপরাধ হতে পারে না, অথচ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে। অন্যদিকে, সিপিএমের এক নেতার প্রতিক্রিয়া, যারা অত্যাচার চালাচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, তবে সবকিছুর জন্য অতীতের সিপিএমকে কাঠগড়ায় তোলার কোনও অর্থ হয় না।

রাজনৈতিক মহলের মতে, আসন্ন রাজনৈতিক দিনগুলিতে এই অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এবং নব্য বনাম পুরনোদের দ্বন্দ্ব বিজেপির অন্দরে বড় মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *