সকালে দেরিতে ঘুম ভাঙলেই অলস ভাবেন? অজান্তেই কোন মারাত্মক ভুল করছেন জানুন!

সকাল হতেই ঘরের জানলার পর্দা সরিয়ে দেওয়া, গরমেও ফ্যান বন্ধ করে দেওয়া কিংবা ছুটির দিনেও সন্তানকে জোর করে বিছানা থেকে তুলে দেওয়া—আমাদের সমাজে এটি খুবই পরিচিত চিত্র। অনেক বাবা-মা বিশ্বাস করেন, যে শিশু বা তরুণ ভোরে ওঠে, সে-ই ভবিষ্যতে বেশি সফল হবে। আর যারা একটু বেলা পর্যন্ত ঘুমায়, তাদের অলস বা দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে মন্তব্য করা হয়। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এই ধারণা সব সময় সঠিক নয়।

বরং চিকিৎসকদের মতে, কাউকে তার ঘুমের সময় বা অভ্যাস নিয়ে লজ্জা দেওয়া, কটূক্তি করা বা অপরাধবোধে ভোগানো এখন একটি বড় মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। এই প্রবণতাকেই বলা হচ্ছে ‘স্লিপ শেমিং’।

মানসম্মত ঘুমই সুস্থ জীবনের ভিত্তি: ঘুম কোনো বিলাসিতা নয়
বর্তমান সময়ে অনেকেই কম ঘুমকে পরিশ্রম, কর্মনিষ্ঠা বা সফলতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। অন্যদিকে পর্যাপ্ত ঘুমকে অলসতা বলে মনে করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম প্রয়োজন। ঘুমের সময়ই শরীর নিজেকে মেরামত করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হয় এবং মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বজায় থাকে। দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এমনকি ডিমেনশিয়ার মতো জটিল রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

ভোরে ওঠাই কি সফলতার চাবিকাঠি?
বহুদিন ধরেই প্রচলিত এই ধারণাকে বিজ্ঞান একপেশে বলে মনে করে। প্রত্যেক মানুষের শরীরে একটি জৈবিক ঘড়ি বা ক্রোনোটাইপ কাজ করে, যা জিন, বয়স ও হরমোনের ওপর নির্ভর করে। কেউ ভোরে সক্রিয় থাকেন, আবার কেউ রাতে ভালো কাজ করেন। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের শরীরে হরমোনগত পরিবর্তনের কারণে রাতে দেরিতে ঘুম আসে এবং সকালে একটু দেরিতে ঘুম ভাঙে। এটি অলসতার লক্ষণ নয়, বরং স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য।

মাঝপথে ঘুম ভাঙানো কেন ক্ষতিকর?
মানুষের ঘুম প্রায় ৯০ মিনিটের বিভিন্ন চক্রে সম্পন্ন হয়। গভীর ঘুমের মাঝপথে জোর করে কাউকে জাগিয়ে দিলে সেই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে ঘুম থেকে ওঠার পর মাথা ভার লাগা, ঝিমুনি, মনোযোগ কমে যাওয়া কিংবা বিরক্তির মতো সমস্যা দেখা দেয়। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া এবং মানসিক চাপ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

‘স্লিপ শেমিং’ কেন বন্ধ করা জরুরি?
অন্যের ঘুমের অভ্যাস নিয়ে বারবার সমালোচনা করা মানসিকভাবে অত্যন্ত ক্ষতিকর। এতে অনেকে শুধু অন্যের চোখে ‘পরিশ্রমী’ প্রমাণ হওয়ার জন্য প্রয়োজনের তুলনায় কম ঘুমাতে শুরু করেন। শরীরের প্রয়োজন উপেক্ষা করলে তার নেতিবাচক প্রভাব সুদূর প্রসারী হতে পারে।

সুস্থ থাকতে বিশেষজ্ঞদের কিছু পরামর্শ:
প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে ও জাগতে চেষ্টা করুন।

ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল, ল্যাপটপ বা টিভির স্ক্রিন থেকে দূরে থাকুন।

বিকেলের পর অতিরিক্ত চা, কফি বা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলুন।

ঘুমের পরিবেশ শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক রাখুন।

অন্যের ঘুমের সময় নিয়ে মন্তব্য না করে নিজের শরীরের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিন। পর্যাপ্ত ঘুম কোনো অলসতার পরিচয় নয়; বরং সুস্থ শরীর, সতেজ মন এবং দীর্ঘমেয়াদি ভালো স্বাস্থ্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *