মহিলাদের এই সাধারণ সমস্যাটিকে কি এতদিন শুধু মা হওয়ার অন্তরায় ভাবতেন? ভুল ভাঙাল নতুন গবেষণা!

দশকের পর দশক ধরে কোটি কোটি নারীকে এটাই বোঝানো হয়েছে যে, পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম বা PCOS মূলত একটি প্রজনন সংক্রান্ত সমস্যা। তবে সাম্প্রতিক একটি চাঞ্চল্যকর গবেষণা এই ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান মহলে এই রোগটির নতুন নামকরণ হয়েছে পলিএন্ডোক্রাইন মেটাবলিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম (PMOS)। গবেষকরা জানিয়েছেন, স্থূলতা, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো প্রচলিত ঝুঁকিগুলো বাদ দিলেও, এই সমস্যায় আক্রান্ত নারীদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা মারাত্মকভাবে বেশি থাকে।

নতুন এই গবেষণাটি প্রমাণ করে যে, এই রোগটি কেবল প্রজননতন্ত্রের সমস্যা নয়, বরং এটি একটি সর্বাঙ্গীন মেটাবলিক বা বিপাকীয় ব্যাধি। তাই এখন থেকেই সচেতন হয়ে দ্রুত রোগ নির্ণয়, নিয়মিত হার্টের পরীক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

৪ গুণ বেশি হৃদরোগের ঝুঁকি
খ্যাতিমান জার্নাল The Lancet Obstetrics, Gynaecology & Women’s Health-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় ২০০২ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী ৪,১৩,৪৫০ জন PMOS/PCOS আক্রান্ত নারী এবং এর পাশাপাশি এই সমস্যা নেই এমন ২০ লক্ষাধিক নারীর স্বাস্থ্য বীমা নথিপত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এটি এই রোগ এবং হৃদস্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে পরিচালিত অন্যতম বৃহত্তম গবেষণা।

গবেষণায় দেখা গেছে, যে নারীদের PMOS রয়েছে, তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অন্য সাধারণ নারীদের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—উচ্চ রক্তচাপ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং স্থূলতার মতো পরিচিত কারণগুলো হিসাবের বাইরে রাখার পরও এই ঝুঁকির মাত্রা একই রকম থেকে গেছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, এই সিন্ড্রোম নিজেই স্বাধীনভাবে হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটাচ্ছে।

কেন PCOS বাড়িয়ে দেয় হার্টের ঝুঁকি?
বিশ্বের প্রতি পাঁচজন প্রজননক্ষম নারীর মধ্যে একজন এই সমস্যায় ভুগে থাকেন। হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, অনিয়মিত মাসিক, পুরুষ হরমোনের (অ্যান্ড্রোজেন) মাত্রা বৃদ্ধি এবং মেটাবলিক জটিলতা এর প্রধান লক্ষণ। এছাড়া অনেক নারী ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, উচ্চ কোলেস্টেরল, দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ এবং ওজন বৃদ্ধির মতো সমস্যায় ভোগেন, যা কার্ডিওভাসকুলার বা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

নতুন গবেষণার তথ্য বলছে, এই পরিচিত কারণগুলোর বাইরেও রোগটি শরীরের ভেতর দীর্ঘমেয়াদে হৃদপিণ্ড ও রক্তনালীর মারাত্মক ক্ষতি করে চলেছে।

শুধু উর্বরতা নয়, পুরো শরীরেই এর প্রভাব
যদিও PCOS বলতেই অনিয়মিত মাসিক এবং বন্ধ্যাত্বর কথা মাথায় আসে, তবে বিশেষজ্ঞরা একে এখন একটি জটিল এন্ডোক্রাইন এবং মেটাবলিক ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করছেন যা শরীরের একাধিক অঙ্গকে প্রভাবিত করে। এর সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:

অনিয়মিত বা বন্ধ থাকা মাসিক

ব্রণ ও তৈলাক্ত ত্বক

মুখ বা শরীরে অতিরিক্ত লোম গজানো

ওজন কমাতে তীব্র অসুবিধা

চুল পাতলা হয়ে যাওয়া বা চুল পড়ে যাওয়া

সন্তান ধারণে সমস্যা

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও মেটাবলিক জটিলতা

এছাড়া টাইপ-২ ডায়াবেটিস, মেটাবলিক সিন্ড্রোম, ফ্যাটি লিভার ডিজিজ, স্লিপ অ্যাপনিয়া এবং মানসিক অবসাদ ও উদ্বেগের মতো মানসিক রোগের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয় এই অবস্থা।

রুটিনমাফিক হার্ট চেকআপের তাগিদ
এই গবেষণার পর চিকিৎসকরা PMOS/PCOS আক্রান্ত নারীদের হৃদস্বাস্থ্যের প্রতি আরও বেশি সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। গবেষকরা উল্লেখ করেছেন যে, অনেক নারী সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয়ের সুযোগ পান না এবং তাদের ভবিষ্যতের হৃদরোগের ঝুঁকি নিয়ে পর্যাপ্ত কাউন্সেলিংও করা হয় না। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি শনাক্ত করা গেলে এবং নিয়মিত রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, রক্তে শর্করার মাত্রা ও ওজন পরীক্ষা করা গেলে ভবিষ্যতে হৃদরোগের আশঙ্কা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

যুক্তরাজ্যের National Institute for Health and Care Excellence (NICE) ইতিমধ্যে PMOS-এ আক্রান্ত নারীদের উপসর্গ পর্যবেক্ষণ এবং সঠিক সময়ে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা এড়াতে বার্ষিক পর্যালোচনার প্রস্তাব দিয়েছে।

ঝুঁকি কি কমানো সম্ভব?
বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগটির সম্পূর্ণ নিরাময় না হলেও প্রাথমিক পর্যায়ে সচেতন হলে এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাবগুলো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। চিকিৎসকদের প্রধান পরামর্শগুলো হলো:

শরীরের আদর্শ ওজন বজায় রাখা

নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়াম করা

ফলমূল, শাকসবজি ও পূর্ণ শস্যসমৃদ্ধ সুষম খাদ্য গ্রহণ করা

রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা

নিয়মিত হৃদরোগের পরীক্ষা বা স্ক্রিনিং করানো

হরমোন ও মেটাবলিক লক্ষণ নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন

জীবনযাত্রার সঠিক পরিবর্তন এবং নিয়মিত চিকিৎসকদের ফলোআপই ভবিষ্যতে হৃদরোগের মারাত্মক জটিলতা থেকে রক্ষা পাওয়ার মূল চাবিকাঠি। PMOS-কে হৃদরোগের একটি অন্যতম প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করে এই গবেষণাটি প্রমাণ করেছে যে একে কেবল প্রজনন স্বাস্থ্য হিসেবে নয়, বরং একটি জীবনব্যাপী মেটাবলিক স্বাস্থ্য হিসেবে দেখা জরুরি। কোটি কোটি নারীর জন্য সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং নিয়মিত হার্ট স্ক্রিনিংই হতে পারে সুস্থ জীবনের একমাত্র ভরসা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *