দিল্লির দিকে লাখো কৃষক! রাস্তাঘাট সিল, কিষাণ ঘাটে মহাপঞ্চায়েতের হুঙ্কার—বড় মোড় নিলেন অন্নদাতারা

ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে দেশের অন্নদাতারা। দিল্লির কিষাণ ঘাটে এক বিশাল মহাপঞ্চায়েতের ডাক দেওয়া হয়েছে। এই মহাপঞ্চায়েতকে কেন্দ্র করে রাজধানী দিল্লির নিরাপত্তা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ স্তরে রাখা হয়েছে। এর আগে থেকেই দিল্লি, জলন্ধর এবং জম্মু জাতীয় মহাসড়কগুলো সম্পূর্ণভাবে সিল করে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে শম্ভু সীমান্তে (পাঞ্জাব-হরিয়ানা সীমান্ত) কৃষকদের দিল্লি অভিমুখে মিছিলে বাধা দিতে বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত কৃষক ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এই মহাপঞ্চায়েতে অংশ নিচ্ছে। দিল্লি অভিমুখে শান্তিপূর্ণ মিছিলে বাধা দেওয়ায় কড়া নিন্দা জানিয়েছেন কৃষক নেতারা।

কেন এই ক্ষোভ? কী আছে চুক্তিটিতে?
দীর্ঘদিন ধরেই ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন কৃষকরা। মূলত ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটি নিয়েই যত আপত্তি। কৃষক সংগঠনগুলির তীব্র অভিযোগ, এই চুক্তি ভারতীয় কৃষি অর্থনীতি এবং সাধারণ কৃষকদের জীবন-জীবিকার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।

যদিও সরকারের দাবি, এই চুক্তি থেকে সংবেদনশীল কৃষি পণ্যগুলিকে সম্পূর্ণ বাদ রাখা হয়েছে, যার ফলে দেশীয় কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। তবে সরকারের এই আশ্বাসে ভরসা রাখতে নারাজ কৃষক সংগঠনগুলি; উল্টে তাদের সাফ কথা, সরকার কৃষকদের স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি আপস করেছে।

কৃষকদের মূল আশঙ্কা কোথায়?
কৃষক মহলের মূল আশঙ্কা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা অত্যন্ত সস্তা ও বিপুল ভর্তুকিপ্রাপ্ত পণ্য ভারতীয় বাজারে চলে আসলে দেশীয় পণ্যের দাম হু হু করে কমে যাবে। এর ফলে দেশের কোটি কোটি গ্রামীণ কৃষকের আয় ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে।

উল্লেখ্য, গত মাসেই কিষাণ মজদুর মোর্চার নেতৃত্বে এই বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে একটি বিশাল বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়, যেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়েছিল।

ক্ষুদ্র কৃষক ও দুগ্ধ খাতের ওপর চরম বিপদের আশঙ্কা
কৃষক নেতাদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষের সঙ্গেই কোনো রকম আলোচনা না করেই অত্যন্ত গোপনে এই চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছে। অল ইন্ডিয়া কিষাণ সভার (AIKS) জাতীয় সভাপতি ড. অশোক ধাওয়ালে এই ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির তীব্র সমালোচনা করে জানিয়েছেন, এই চুক্তির ফলে আমেরিকান কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যের ওপর এতদিন ধরে থাকা ৩৫ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি শুল্ক কমিয়ে সরাসরি ০ শতাংশ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, আমদানির ওপর থাকা অন্যান্য করও সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হয়েছে।

ড. ধাওয়ালের মতে, ভারতীয় কৃষকদের জমির পরিমাণ অত্যন্ত কম। পাশাপাশি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৃষকরা যে উচ্চ পরিমাণ সরকারি ভর্তুকি পান, ভারতীয় কৃষকরা তার সিকিভাগও পান না। ফলে শুল্কমুক্ত আমেরিকান পণ্যে বাজার ভেসে গেলে দেশীয় কৃষকরা পুরোপুরি মার খাবেন এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়বে। তিনি এই চুক্তিকে “ভারতীয় কৃষি স্বার্থের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা” বলে অভিহিত করে বলেন যে, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জীবিকা রক্ষার পরিবর্তে মার্কিন কৃষি-ব্যবসায়ীদের সুবিধা পাইয়ে দিতেই এই নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *