‘মনটা কেমন করছে মা’—স্কুলে যাওয়ার ৫ মিনিট পরেই সব শেষ, মুর্শিদাবাদের দুর্ঘটনায় শোকের ছায়া

জন্মদিনের চকলেট নিয়ে বন্ধুদের মাঝে আর ফেরা হলো না ৯ বছরের ইসারুল রহমানের। মুর্শিদাবাদের বহরমপুর থানার কর্ণসুবর্ণ স্টেশন সংলগ্ন গোবিন্দপুর রেলগেটে শুক্রবার সকালে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে চার স্কুল পড়ুয়া ও এক সাইকেল আরোহী। মর্মান্তিক এই ঘটনায় এলাকায় শোকের কালো ছায়া নেমে এসেছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট:
স্থানীয় সূত্রে খবর, শুক্রবার সকালে পড়ুয়াদের নিয়ে পুলকারটি যখন গোবিন্দপুর রেলগেট পার হচ্ছিল, ঠিক সেই সময় ট্রেনের ধাক্কায় সেটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, রেল গেটম্যানের চরম গাফিলতির কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। গেট খোলা থাকায় পুলকারটি রেললাইনের ওপর চলে আসে এবং অকুস্থলেই ঘটে বিপর্যয়।
ইসারুলের অপূর্ণ স্বপ্ন:
বৃহস্পতিবার ছিল তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র ইসারুলের ৯তম জন্মদিন। রথযাত্রা উপলক্ষে স্কুল ছুটি থাকায় বন্ধুদের সঙ্গে সেদিন দেখা হয়নি তার। মায়ের কাছে বায়না ধরেছিল, শুক্রবার স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের চকলেট খাওয়াবে। সেই মতো চকলেট নিয়ে হাসিমুখে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল সে। কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে সব শেষ হয়ে গেল। ছেলের নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে মা আজিজা খাতুন কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “বন্ধুত্বের কত পরিকল্পনা ছিল ওর, সেই চকলেট নিয়ে আর স্কুলে পৌঁছানো হলো না।”
শোকে পাথর পরিবার:
একইসঙ্গে তামান্না ও জামশেদ নামের অন্য দুই পড়ুয়ার পরিবারও শোকের সাগরে ভাসছে। দুর্ঘটনায় জেসিকা শবনমের অকাল প্রয়াণে তার মা শেফালী খাতুন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, “বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় জেসিকা বলেছিল, ‘মা, মনটা কেমন করছে, একটু জল দাও।’ জল খাইয়ে ওকে বিদায় জানিয়েছিলাম। তার ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যেই মাইকিংয়ে দুর্ঘটনার খবর পাই। ছুটে গিয়ে দেখি আমার সব শেষ হয়ে গেছে।”
প্রশাসনের ভূমিকা:
ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও শোক কাটেনি গোবিন্দপুর গ্রামের। এলাকাবাসীর অভিযোগ, রেল গেটম্যানের গাফিলতিই এই প্রাণহানির মূল কারণ। কেন গেট খোলা ছিল, তা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। একদিকে যখন চার শিশু ও এক সাইকেল আরোহীর মৃত্যুতে পরিবারগুলোতে শোকের রোল, অন্যদিকে স্থানীয়দের মধ্যে গেটম্যান ও রেল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ দানা বেঁধেছে।
এই ঘটনায় এলাকায় পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে রেল বিভাগ উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে।