২ তলা সিঁড়ি উঠতেই বুক ধড়ফড় আর দম বন্ধ ভাব? অলসতা ভেবে এড়িয়ে গেলে হতে পারে হার্ট অ্যাটাক!

চার-পাঁচ ধাপ বা বড়জোর এক-দু’ তলা সিঁড়ি ওঠার পরেই কি আপনার বুক ধড়ফড় করতে শুরু করে? দম আটকে আসে, আর মনে হয় একটু বসি? আমাদের চারপাশে এমন অনেকেই আছেন, যারা এই সমস্যাটিকে স্রেফ ‘অলসতা’ বা ওজনের আধিক্য ভেবে হালকাভাবে উড়িয়ে দেন। বর্তমানের আধুনিক ফ্ল্যাট কালচার বা কর্পোরেট অফিসে লিফটের বাড়বাড়ন্তের কারণে আমাদের সিঁড়ি ব্যবহারের অভ্যাস এমনিতেই তলানিতে ঠেকেছে। কিন্তু যখনই কোনো বাধ্যবাধকতায় সিঁড়ি ভাঙতে হয়, তখনই যদি হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক বেড়ে যায়, তবে চিকিৎসকদের মতে এটিকে অবহেলা করা মানে নিজের পায়ে নিজে কুড়ুল মারা।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, সিঁড়ি ওঠার সময় এভাবে হাঁপিয়ে ওঠার পেছনে অলস জীবনযাত্রার চেয়েও গভীর কিছু শারীরিক কারণ ও গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি লুকিয়ে থাকতে পারে।
কেন সিঁড়ি ভাঙতে গেলেই শরীর জবাব দেয়?
অক্সিজেনের তীব্র ঘাটতি: সমতল রাস্তায় হাঁটার তুলনায় অভিকর্ষের বিপরীতে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা অনেক বেশি কঠিন কাজ। এই সময়ে আমাদের পায়ের পেশিগুলোকে শরীরের ভর ধরে রাখতে অতিরিক্ত শক্তি খরচ করতে হয়। ফলে শরীর এক নিমেষে প্রচুর অক্সিজেনের দাবি করে বসে। আর সেই অক্সিজেনের ঘাটতি মেটাতে হৃৎপিণ্ডকে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ দ্রুত গতিতে রক্ত পাম্প করতে হয়। যার জেরে বুক ধড়ফড়ানি শুরু হয়।
হার্ট ও ফুসফুসের কর্মক্ষমতা হ্রাস: যারা সারাদিন চেয়ার-টেবিলে বসে কাজ করেন এবং কোনো রকম শরীরচর্চা বা কায়িক পরিশ্রমের মধ্যে থাকেন না, তাদের হার্ট ও ফুসফুসের কার্যক্ষমতা প্রাকৃতিকভাবেই কমতে থাকে। ফলে সামান্য পরিশ্রমেও শরীর হাঁপিয়ে ওঠে।
ডিহাইড্রেশন ও অতিরিক্ত ক্যাফেইন: শরীরে জলের ঘাটতি বা ডিহাইড্রেশন থাকলে সামান্য কাজও পাহাড়প্রমাণ মনে হতে পারে। এছাড়া যারা সারাদিনে অতিরিক্ত চা, কফি বা এনার্জি ড্রিংকস পান করেন, তাদের শরীরে ক্যাফেইনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে সিঁড়ি ভাঙার সময় বুকে এক ধরণের চাপ ও অস্বস্তি তৈরি হয়।
লুকিয়ে থাকা কোন কোন রোগের লক্ষণ এটি?
চিকিৎসকদের কড়া বার্তা—বারবার সিঁড়ি চড়তে গিয়ে দম ফুরিয়ে যাওয়া কেবল ক্লান্তির লক্ষণ নাও হতে পারে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে শরীরে রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া (Anemia) থাকলে এই উপসর্গ খুব বেশি দেখা যায়। এছাড়া শরীরে আয়রনের ঘাটতি, থাইরয়েডের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ (High Blood Pressure) কিংবা হার্টের কোনো ব্লকেজ বা ক্রনিক হৃদ্রোগের প্রাথমিক সংকেতও হতে পারে এই শ্বাসকষ্ট।
এই কষ্ট থেকে রেহাই পাওয়ার উপায়:
কার্ডিও ব্যায়াম: হার্ট ও ফুসফুসের পাম্প করার ক্ষমতা বাড়াতে প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত ২০-৩০ মিনিট কার্ডিও ব্যায়াম বা জোরে হাঁটার অভ্যাস করুন।
সিঁড়িকেই বানান হাতিয়ার: লিফট পুরোপুরি বর্জন করে প্রতিদিন ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করার অভ্যাস তৈরি করুন। এটি আপনার পায়ের পেশি মজবুত করবে এবং হার্টকে ভালো রাখবে।
শরীরের গতি বুঝুন: সিঁড়ি ওঠার সময় হাঁপিয়ে গেলে জোর করে ওপরে না উঠে মাঝপথে দাঁড়িয়ে একটু বিশ্রাম নিন এবং শান্ত হয়ে শ্বাস নিন।
বিশেষ সতর্কবার্তা:
সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় যদি দ্রুত হৃদস্পন্দনের পাশাপাশি বুকে তীব্র ব্যথা বা চাপ অনুভব হয়, মাথা ঘুরে ওঠে, অতিরিক্ত ঘাম হতে থাকে কিংবা চোখের সামনে অন্ধকার দেখেন—তবে এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে অবিলম্বে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যোগাযোগ করুন বা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। সুস্থ থাকতে লক্ষণ চেনা ও সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।