মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্সে সাড়ে ৩ লক্ষ কোটির মহা-ধাক্কা! ২০২৬-এ কেন নিঃস্ব হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা?

ভারতের কর্পোরেট জগতের বেতাজ বাদশা মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (RIL)-এর জন্য ২০২৬ সালটি এখনও পর্যন্ত অত্যন্ত কঠিন সময় হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে। চলতি বছরে রিলায়েন্সের শেয়ারের দাম ১৫ শতাংশেরও বেশি কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের পকেট থেকে প্রায় ৩.৫৩ লক্ষ কোটি টাকার বিপুল সম্পত্তি মুছে গেছে। বাজার বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, সম্প্রতি এই স্টকটি তার ৫২-সপ্তাহের সর্বোচ্চ দর (৫ জানুয়ারী, ₹১,৬১১.২০) থেকে প্রায় ২০% নিচে ট্রেড করছে। এই পরিস্থিতিতে সবার চোখ এখন কোম্পানির জুন ত্রৈমাসিকের (Q1) ফলাফলের দিকে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে শেষ ভরসা হতে পারে।
কেন এই পতন? চাপের মুখে রিলায়েন্সের ৪ স্তম্ভ
রিলায়েন্সের বর্তমান মূল্যায়ন মূলত চারটি প্রধান স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে— তেল থেকে রাসায়নিক (O2C), জিও (Jio), রিটেল (খুচরা ব্যবসা) এবং তেল ও গ্যাস উৎপাদন। কিন্তু সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিকগুলিতে এই বিভাগগুলি সম্মিলিতভাবে আশানুরূপ ফল করতে পারেনি:
খুচরা ব্যবসা: নতুন শ্রম আইনের প্রভাব, উৎসবের ছাড় এবং হাইপার-লোকাল ডেলিভারি স্টার্টআপে বিনিয়োগের কারণে রিটেল প্রবৃদ্ধি মন্থর রয়েছে।
তেল ও গ্যাস (O2C): ইরানের সাথে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, উইন্ডফল ট্যাক্স, উচ্চ মালবাহী পরিবহন খরচ এবং চিনের সাথে প্রতিযোগিতার কারণে রিলায়েন্সের সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস O2C ব্যবসা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
প্রথম ত্রৈমাসিকের ফলাফল কি ঘটাবে মিরাকল?
ব্রোকারেজ সংস্থাগুলির মতে, প্রথম ত্রৈমাসিকের ফলাফল রিলায়েন্সের শেয়ারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। স্টকটির উল্লেখযোগ্য পুনর্মূল্যায়নের জন্য বিনিয়োগকারীদের এখন প্রধানত ৩টি বিষয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত প্রয়োজন— উন্নত রিটেইল মার্জিন, তেল-গ্যাস খাতের দুর্বলতা কাটানো এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, জিও আইপিও (Jio IPO)-র সুস্পষ্ট সময়সীমা।
O2C এবং জিও-র হাত ধরেই কি কামব্যাক?
মন্দার বাজারেও রিলায়েন্সের ত্রৈমাসিক পারফরম্যান্স স্থিতিশীল রাখতে O2C এবং টেলিকম সেক্টর মূল চালিকাশক্তি হতে পারে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা:
O2C খাতের পূর্বাভাস: কোটাক ইকুইটিজের প্রত্যাশা, রিলায়েন্সের সমন্বিত EBITDA বার্ষিক ভিত্তিতে ৮.৪% বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (SEZ) শোধনাগারগুলোর শক্তিশালী আয় এবং দুর্বল রুপির কারণে এই খাতটি লাভবান হবে। অন্যদিকে, জেফারিস আরও ইতিবাচক বার্তা দিয়ে O2C EBITDA ২০% বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। যদিও ইয়েস সিকিউরিটিজের মতে, পরিশোধনের মোট পরিমাণ কিছুটা হ্রাস পেয়ে ১৬.৮ মিলিয়ন মেট্রিক টনে দাঁড়াতে পারে।
জিও-র লাগাতার সমর্থন: ডিজিটাল পরিষেবা ক্ষেত্রে নুভামা আশা করছে যে, ব্যবহারকারী প্রতি গড় আয় (ARPU) ৩% এবং গ্রাহক সংখ্যা ৭% বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে জিও-র EBITDA বার্ষিক ভিত্তিতে ১১% বৃদ্ধি পাবে। ইয়েস সিকিউরিটিজের মতে, গ্রাহক সংখ্যা হতে পারে ৫৩১.৬ মিলিয়ন। তবে সংখ্যার চেয়েও বাজার এখন ৫জি থেকে আয় এবং জিও-র বহুল প্রতীক্ষিত লিস্টিং বা আইপিও-র রোডম্যাপের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে রয়েছে।
রিটেল খাতের অগ্নিপরীক্ষা
একসময় রিলায়েন্স রিটেলকে শেয়ারের দাম বাড়ানোর মূল অনুঘটক ধরা হলেও, বর্তমানে তা উদ্বেগের কারণ। কোটাক আশা করছেন, রিটেল EBITDA আগের ত্রৈমাসিকের তুলনায় ২.৬% কমতে পারে। তবে ইয়েস সিকিউরিটিজ আশা করছে রিটেইল রাজস্ব বার্ষিক ১৬% বৃদ্ধি পেয়ে ৯৭,৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছাবে। নতুন দোকান খোলা, ক্রেতাদের আনাগোনা এবং ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল পণ্যের বিক্রির ওপর নির্ভর করছে রিটেল খাতের ভাগ্য।
বাজারের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে?
দালাল স্ট্রিটের বিশেষজ্ঞদের মতে, স্টকটি নিয়ে বাজারে ইতিমধ্যেই কিছুটা হতাশা তৈরি হয়েছে। তবে প্রথম ত্রৈমাসিকের ফলাফলে যদি সব ক্ষেত্রে ইতিবাচক উন্নতি দেখা যায় এবং ম্যানেজমেন্টের মনোভাব আত্মবিশ্বাসী হয়, তবে আরআইএল (RIL)-এর শেয়ারে একটি দুর্দান্ত স্বস্তিদায়ক ঊর্ধ্বগতি (Relief Rally) দেখা যেতে পারে। আর তা না হলে, আম্বানির শেয়ারে সুদিন ফিরতে বাজারকে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।