ফ্রি-র দিন শেষ? এবার UPI লেনদেনেও বসছে অতিরিক্ত চার্জ! মোদী সরকারের নতুন ভাবনায় তোলপাড়!

ভারতে ডিজিটাল বিপ্লবের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো ইউপিআই (UPI বা Unified Payments Interface)। চা-ওয়ালা থেকে শুরু করে বড় শপিং মল— সর্বত্রই এখন নগদ টাকার বদলে ইউপিআই-এর জয়জয়কার। কিন্তু এবার কোটি কোটি ইউপিআই ব্যবহারকারী এবং ব্যবসায়ীদের জন্য আসতে চলেছে এক বড়সড় ধাক্কা। দেশে ডিজিটাল লেনদেনের প্রচার ও প্রসারের জন্য ২০২০ সালে যে ‘এমডিআর’ (MDR – Merchant Discount Rate) বা মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট তুলে দেওয়া হয়েছিল, প্রায় ৬ বছর পর তা আবারও ফিরিয়ে আনার কথা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে কেন্দ্র সরকার।
জানা গেছে, বড় বড় কর্পোরেট ও বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট কিছু ইউপিআই লেনদেনের ওপর এই এমডিআর চার্জ পুনর্প্রবর্তন করা হতে পারে। তবে এই প্রস্তাবটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি, সরকারের উচ্চস্তরে এটি নিয়ে আলোচনা চলছে।
কারা আসবেন এই নতুন নিয়মের আওতায়?
‘দ্য ইকোনমিক টাইমস’-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার সমস্ত লেনদেনের ওপর এই চার্জ বসাচ্ছে না। যে সমস্ত ব্যবসায়ীদের বার্ষিক টার্নওভার ১ কোটি টাকা বা তার বেশি, শুধুমাত্র তাঁদের ওপরেই এই চার্জ প্রযোজ্য হতে পারে। এছাড়া, কেবল ২,০০০ টাকার বেশি ইউপিআই লেনদেনের ক্ষেত্রেই এই ফি লাগু করার কথা ভাবা হচ্ছে।
এর মানে পরিষ্কার— আপনার পাড়ার মুদি দোকানদার, ছোট ব্যবসায়ী, হকার এবং সাধারণ মধ্যবিত্ত গ্রাহকদের পকেটে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। মোট ইউপিআই মার্চেন্টদের প্রায় ৯০ শতাংশই ছোট ব্যবসায়ী হওয়ায়, তাঁদের সম্পূর্ণ এই আওতার বাইরে রাখা হবে।
কী এই MDR এবং কেন তা ফেরানোর তোড়জোড়?
মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা এমডিআর হলো এমন একটি ফি, যা কোনো গ্রাহক ডিজিটাল পেমেন্ট করার পর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীকে ব্যাংক এবং পেমেন্ট প্রসেসর সংস্থাকে দিতে হয়। এটি মূলত ডিজিটাল পেমেন্ট প্রসেসিং, সার্ভার রক্ষণাবেক্ষণ, সাইবার নিরাপত্তা এবং ফান্ড সেটেলমেন্টের খরচ মেটাতে ব্যবহৃত হয়।
২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে সরকার ইউপিআই এবং রুপে (RuPay) ডেবিট কার্ডের ওপর এমডিআর শূন্য (০) করে দেয়। এর ফলে দেশে ইউপিআই-এর ব্যবহার রকেট গতিতে বাড়ে। কিন্তু বর্তমানে ইউপিআই লেনদেনের সুনামি আসায় ব্যাংক ও ডিজিটাল পেমেন্ট কোম্পানিগুলোর পক্ষে বিনামূল্যে এই পরিষেবা দেওয়া অর্থনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে পড়েছে। কোটি কোটি লেনদেন সামলাতে তাদের সার্ভার ও প্রযুক্তির পেছনে বিপুল খরচ হচ্ছে। সরকার প্রতি বছর এই খাতের জন্য ভর্তুকি দিলেও, তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম বলে দাবি পে-টেক সংস্থাগুলোর। আর সেই কারণেই বড় ব্যবসায়ীদের ওপর সীমিত আকারে এমডিআর চালুর প্রস্তাব উঠেছে।
কত টাকা কাটা হতে পারে?
রিপোর্ট অনুযায়ী, ২,০০০ টাকার উপরের লেনদেনের ক্ষেত্রে মোট পরিমাণের ০.০৫% থেকে ০.০৭% (৫ থেকে ৭ বেসিস পয়েন্ট) এমডিআর ধার্য করা হতে পারে। যদিও এর আগে পেমেন্টস কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া বড় ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ০.৩০% এমডিআর রাখার সুপারিশ করেছিল।
ভর্তুকি কমিয়েছে সরকার, ইঙ্গিত দিয়েছিলেন আরবিআই গভর্নরও
চলতি বছরের মার্চ মাসে ফিন্যান্স সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিও ইউপিআই-এর জন্য একটি ধাপে ধাপে (Graded) এমডিআর ব্যবস্থা চালু করার সুপারিশ করেছে। তবে ছোট শহর এবং ছোট ব্যবসায়ীদের ক্যাশব্যাক ও ভর্তুকি চালু রাখার কথাও বলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছরই আরবিআই (RBI) গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, ইউপিআই পরিষেবা সারাজীবন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া সম্ভব নয়। পরিসংখ্যান বলছে, কেন্দ্র সরকার এই খাতে ভর্তুকির পরিমাণ অনেকটাই কমিয়ে এনেছে। ২০২৪ অর্থবর্ষে যেখানে ভর্তুকি ছিল ৩,৬৩১ কোটি টাকা, ২০২৫-এ তা কমে হয় ২,০০০ কোটি এবং ২০২৬ অর্থবর্ষে তা আরও কমিয়ে মাত্র ৪৩৭ কোটি টাকা করা হয়েছে। ফলে পরিকাঠামো টিকিয়ে রাখতে আগামী দিনে বড় লেনদেনে চার্জ বসা একপ্রকার নিশ্চিত বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।