বিশেষ: ১৫০০ বছর আগে যেভাবে উৎপত্তি দাবা খেলার, জেনেনিন দাবার হাজার বছরের ইতিহাস

রাজা, মন্ত্রী, হাতি, ঘোড়া আর সেনাদল—পুরো রাজত্ব যখন আপনার হাতের মুঠোয়, আর চাল দেওয়ার প্রতিটি মুহূর্তে লুকিয়ে থাকে রণকৌশল, তখন তাকেই বলা হয় দাবা। আজ ২০ জুলাই, আন্তর্জাতিক দাবা দিবস। এই প্রাচীন ও বর্ণময় খেলার ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের সাক্ষী থাকতে আজ বিশ্বজুড়ে মেতে উঠেছেন দাবাড়ুরা।
ইতিহাসের পাতায় দাবার জন্ম: গবেষকদের মতে, দাবার উৎপত্তিস্থল আমাদের ভারত। প্রায় দেড় হাজার বছর আগে গুপ্ত সাম্রাজ্যের সময়কালে ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এই খেলার জন্ম হয়েছিল, যা তখন পরিচিত ছিল ‘চতুরঙ্গ’ নামে। নামটির অর্থ—চার (চতু) দিক থেকে গমনযোগ্য অংশ (অঙ্গ), অর্থাৎ হাতি, ঘোড়া, রথ ও পদাতিক সৈন্য। লোককথা অনুযায়ী, লঙ্কেশ্বরী মন্দোদরী রাবণকে যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত করতে এই খেলার সূচনা করেছিলেন।
নামের বিবর্তন ও বিশ্বভ্রমণ: ভারত থেকে পারস্যে পৌঁছানোর পর এই খেলার নাম হয়ে যায় ‘শতরঞ্জ’। মূলত পারস্য বর্ণমালায় ‘চ’ এবং ‘গ’-এর অভাব থাকায় সেটি ‘শ’ এবং ‘জ’-তে রূপান্তরিত হয়। এরপর খেলাটি চীন, স্পেন ও ইউরোপের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। একেক দেশে এর নামও বদলেছে—কোথাও ‘Xadrez’ তো কোথাও ‘ইয়াট্রিকিওন’। আধুনিক দাবার রূপটি মূলত ইউরোপেই বিকশিত হয়েছিল।
আধুনিক দাবার পথচলা: উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, ১৮৫১ সালে লন্ডনে প্রথম আধুনিক দাবা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন ব্রিটিশ দাবাড়ু হাওয়ার্ড স্ট্যাউনটন। ১৮৮৬ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয়। বিংশ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ওয়ার্ল্ড চেস ফেডারেশন’ (FIDE)। একবিংশ শতাব্দীতে কম্পিউটার ও অনলাইন দাবার প্রভাবে এই খেলাটি এখন ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে।
কেন আজ আন্তর্জাতিক দাবা দিবস? ১৯২৪ সালের ২০ জুলাই প্যারিসে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘দ্য ইন্টারন্যাশনাল চেস ফেডারেশন’ (FIDE)। সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা দিবসকেই স্মরণীয় করে রাখতে ১৯৬৬ সাল থেকে প্রতি বছর ২০ জুলাই আন্তর্জাতিক দাবা দিবস পালিত হয়। ২০১৯ সালের ১২ ডিসেম্বর রাষ্ট্রসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (UNESCO) এই দিনটিকে বিশ্ব দাবা দিবস হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।
দাবার দুনিয়ার কিংবদন্তিরা: দাবার ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছেন একাধিক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। এমানুয়েল লাসকার, গ্যারি ক্যাসপারভ এবং অ্যানাতলি কারপভ—এই তিন কিংবদন্তি সর্বোচ্চ ছ’বার করে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। এছাড়াও মিখাইল বতভিনিক, বর্তমানের ম্যাগনাস কার্লসেন এবং ভারতের গর্ব বিশ্বনাথন আনন্দ পাঁচবার করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক দাবা সংস্থার লক্ষ্য হলো, এই দিনে প্রতিটি দাবাপ্রেমী অন্তত একজন নতুন মানুষকে দাবার প্রতি আকৃষ্ট করবে। দাবার সেই পুরোনো গৌরব ও বুদ্ধির লড়াই আজও অটুট, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে শেখায়—ধৈর্য ও সঠিক চালই পারে জীবনের কঠিন যুদ্ধে জয় এনে দিতে।