ক্রিকেটের DRS বনাম ফুটবলের VAR—জেনেনিন কোনটি সেরা প্রযুক্তি?

আধুনিক ক্রীড়াজগতে প্রযুক্তির ছোঁয়া খেলাকে যতটা নিখুঁত করেছে, ঠিক ততটাই বাড়িয়ে দিয়েছে বিতর্ক। বিশেষ করে ক্রিকেটের ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম (DRS) এবং ফুটবলের ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR)—এই দুই প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মত। কোনটা খেলার ছন্দ বজায় রেখে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করছে, আর কোনটা গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
ক্রিকেটের ডিআরএস: স্বচ্ছতার দর্পণ
ক্রিকেটের ডিআরএস প্রযুক্তিকে বলা যায় ‘খেলোয়াড়কেন্দ্রিক প্রযুক্তি’। এখানে অন-ফিল্ড আম্পায়ারের মানবিক ভুলের সুযোগ সংশোধনের পূর্ণ অধিকার থাকে খেলোয়াড়দের হাতে। হক-আই (Hawk-Eye) বা আল্ট্রা-এজ (Ultra-Edge)-এর মতো প্রযুক্তির ব্যবহার দর্শকরা সরাসরি মাঠের বড় পর্দায় দেখতে পান, যা ম্যাচে এক ধরনের স্বচ্ছতা তৈরি করে। ফলে আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ম্যাচ হারার ভয় যেমন কমেছে, তেমনি দর্শকরাও প্রযুক্তির সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকছেন। ডিআরএস এখন ক্রিকেটের অবিচ্ছেদ্য ও জনপ্রিয় অংশ।
ফুটবলের ভিএআর: বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু
ফুটবলের ভিএআর প্রযুক্তি মাঠে চালু হওয়ার পর থেকেই ফুটবল বোদ্ধাদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। ফুটবলের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি মাঠের বাইরের ম্যাচ অফিসিয়ালদের হাতে। মাঠের রেফারিকে বারবার মনিটরে গিয়ে রিপ্লে দেখতে হয়, যা খেলার গতিশীল ছন্দকে বারবার ব্যাহত করে। স্টেডিয়ামের দর্শকদের কাছে এটি প্রায়শই বিভ্রান্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ‘মিলিমিটার অফসাইড’ বা সূক্ষ্ম ফাউলের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির হস্তক্ষেপ ফুটবলের স্বাভাবিক উত্তেজনাকে অনেক সময় ম্লান করে দিচ্ছে।
দুই প্রযুক্তির মূল পার্থক্য:
১. নিয়ন্ত্রণের জায়গা: ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের চ্যালেঞ্জ জানানোর সুযোগ থাকলেও, ফুটবলে ভিএআর পুরোপুরি রেফারির ওপর নির্ভরশীল।
২. খেলার ছন্দ: ক্রিকেটে ডিআরএস বিরতির সময় বা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় খেলাকে খুব একটা ধীর করে না, কিন্তু ভিএআর-এর জন্য রেফারি যখন মনিটরের সামনে যান, তখন ম্যাচের গতি সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়।
৩. দর্শকদের অংশগ্রহণ: ক্রিকেট দর্শকরা প্রযুক্তির সিদ্ধান্তকে লাইভ গ্রাফিক্সের মাধ্যমে উপভোগ করেন, ফুটবলে এই প্রক্রিয়াটি অনেক সময় দীর্ঘ ও অস্বচ্ছ মনে হয়।
ভবিষ্যৎ ভাবনা
ফুটবল একটি গতিশীল খেলা, যেখানে মুহূর্তের সিদ্ধান্তই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কিন্তু প্রযুক্তি যখন সেই গতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখনই প্রশ্ন ওঠে এর কার্যকারিতা নিয়ে। ক্রিকেট যেভাবে ডিআরএস-কে আপন করে নিয়েছে, ফুটবলের ভিএআর এখনও সেই জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে অনেকটাই পিছিয়ে।
তবে নিখুঁত সিদ্ধান্ত যে কোনো খেলারই অপরিহার্য অঙ্গ। তাই আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ামক সংস্থাগুলো (IFAB/FIFA) যদি ভিএআর-এর প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন এনে খেলার ছন্দ বজায় রাখার পথ খুঁজে পায়, তবেই হয়তো ফুটবলের প্রযুক্তির বিতর্ক স্থায়ীভাবে মিটবে। প্রযুক্তির লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয়ী হতে হবে খেলাকেই, প্রযুক্তির যান্ত্রিকতাকে নয়।