ভাড়া বাড়ল ৯ গুণ! ভারতগামী তেলের জাহাজে এ কী মহাকাণ্ড? কাঁপছে গোটা বিশ্বের বাণিজ্য দুনিয়া!

বিশ্ব বাণিজ্য ও জাহাজ শিল্পে এক অভূতপূর্ব এবং শিউরে ওঠার মতো কাণ্ড ঘটে গেছে। পারস্য উপসাগর থেকে ভারতে অপরিশোধিত তেল বহনকারী একটি বিশাল সুপারট্যাঙ্কারের বুকিং রেট রাতারাতি এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা দেখে চোখ কপালে উঠেছে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের। সাধারণ ভাড়ার চেয়ে প্রায় ৯ গুণ (৮৯৭ শতাংশ) বেশি হারে বুক করা হয়েছে এই বিশালাকার জাহাজটি। দক্ষিণ কোরীয় কোম্পানি ‘সিনোকর’-এর মালিকানাধীন এই সুপারট্যাঙ্কারটির একবারে প্রায় ২০ লক্ষ ব্যারেল তেল বহনের ক্ষমতা রয়েছে। (তথ্যসূত্র: Asianetnews Bangla)

১ ডলারের ভাড়া রাতারাতি প্রায় ৯ ডলার!
জাহাজ শিল্পে মালবাহী জাহাজের ভাড়া সাধারণত ‘ওয়ার্ল্ডস্কেল রেট’-এর ভিত্তিতে গণনা করা হয়। বেঞ্চমার্ক রেটের নিরিখে এই সুপারট্যাঙ্কারটি রেকর্ড ৮৯৭ ওয়ার্ল্ডস্কেল পয়েন্টে বুক করা হয়েছে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, যেখানে সাধারণ পরিস্থিতিতে প্রতি ব্যারেল তেল পরিবহনের ভাড়া ১ ডলার হওয়ার কথা, সেখানে বর্তমান সংকটের জেরে কোম্পানিটি একই পরিমাণ তেলের জন্য প্রতি ব্যারেলে ৮.৯৭ ডলার চার্জ করছে। পারস্য উপসাগর থেকে সিঙ্গাপুর ও ভারত রুটের এই বুকিং রেট পুরো আন্তর্জাতিক বাজারকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

সমুদ্রের বুকে হঠাৎ কেন এই হাহাকার?
হঠাৎ করে কেন বিশ্বজুড়ে খালি জাহাজের এমন তীব্র সংকট দেখা দিল? এর প্রধান নেপথ্যে রয়েছে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি। গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমার পরিস্থিতি চরম জটিল হয়ে ওঠে। রণক্ষেত্রের উত্তাপে প্রায় টানা তিন মাসের জন্য বন্ধ হয়ে যায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ‘হরমুজ প্রণালী’।

যুদ্ধকালীন ঝুঁকির কারণে বেশিরভাগ বড় জাহাজ মালিকরাই পারস্য উপসাগর থেকে তাঁদের নৌবহর সরিয়ে নিরাপদ অন্য সমুদ্রপথে নিয়ে যান। বর্তমানে যুদ্ধ পরিস্থিতি কিছুটা থিতিয়ে এলেও, সরিয়ে নেওয়া সেই বিশালাকার জাহাজগুলোর পারস্য উপসাগরে ফিরে আসতে এখনও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে। এর ফলেই এই মুহূর্তে পারস্য উপসাগরে খালি তেলের ট্যাঙ্কারের প্রাপ্যতা তলানিতে ঠেকেছে, যার জেরে হু হু করে বাড়ছে ভাড়া।

যুদ্ধ থামতেই তেলের বাজারে হুলুস্থুল!
সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। আর এই চুক্তি হতেই থমকে থাকা আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে হঠাৎ করেই সুনামি এসেছে। যেসব বৈশ্বিক ক্রেতারা গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে নিজেদের আটকে থাকা তেলের চালান খালাস করার জন্য চাতকের মতো অপেক্ষা করছিলেন, তাঁরা এখন হন্যে হয়ে তেলের ট্যাঙ্কার খুঁজছেন। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোও বিশ্ববাজারে নিজেদের রপ্তানি বাড়াতে চরম তাড়াহুড়ো শুরু করেছে।

এই চরম চাহিদার সুযোগকেই পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানি সিনোকর। ইরাকের বসরা টার্মিনাল থেকে তেল বোঝাই করার জন্য নিজেদের বিশাল ভিএলসিসি (VLCC) জাহাজগুলোর প্রস্তাব দিয়ে বাজার নিজেদের দখলে নিয়েছে তারা। হরমুজ প্রণালীর যান চলাচল এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলেও, সিনোকর এই ঝুঁকিপূর্ণ রুটেই যাতায়াতের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। তবে বিশ্ব বাজারে আলোড়ন সৃষ্টি করা এই রেকর্ড চুক্তিটি সম্পর্কে সিনোকরের সিউল বা সিঙ্গাপুর অফিস থেকে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *