সিন্ডিকেট নেতারা বেপাত্তা, প্রমোটারদের স্বস্তি, এবার কি ফ্ল্যাটের দাম কি কমবে?

রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই উত্তাল বঙ্গ রাজনীতি। এই পরিবর্তনের রেশ এবার সরাসরি আছড়ে পড়ল নির্মাণ শিল্পে। এতদিন যে ‘সিন্ডিকেট রাজ’-এর দাপটে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল আবাসন ও নির্মাণ শিল্প, বিজেপির নতুন সরকারের প্রথম কয়েক সপ্তাহের প্রশাসনিক কড়াকড়িতে সেই পরিস্থিতির বদলের আভাস মিলছে।
পুলিশের অবস্থান বদল নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে যুক্তদের একাংশের দাবি, আগে থানায় অভিযোগ জানাতে গেলে পুলিশ অনেক সময় ‘মিটিয়ে নেওয়ার’ পরামর্শ দিত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে চিত্রটি সম্পূর্ণ আলাদা। এখন নির্মাতাদের স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, তোলাবাজদের কোনো টাকা না দিতে। পুলিশের এই কঠোর অবস্থানই আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে শিল্পমহলের।
ইএম বাইপাস থেকে উধাও সিন্ডিকেট! ইএম বাইপাস সংলগ্ন একটি বৃহৎ প্রকল্পের এক আধিকারিক জানান, গত কয়েক সপ্তাহে স্থানীয় সিন্ডিকেট সদস্যদের আর দেখা যাচ্ছে না। আগে প্রতিদিন ট্রাক ভর্তি বালির পরিমাণ থেকে শুরু করে যাবতীয় সরবরাহে সিন্ডিকেটের খবরদারি মানতে হতো। এখন সেই বালাই নেই। এমনকি যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও এক সিন্ডিকেট নেতাকে পাওয়া যায়নি, তিনি বর্তমানে গা-ঢাকা দিয়েছেন। যদিও সরবরাহের ক্ষেত্রে সাময়িক সমস্যা হলেও নতুন সরবরাহকারীদের মাধ্যমে গুণগত মান ও পরিমাণের নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে, যা আগে বিরল ছিল।
তোলাবাজির ভয়ঙ্কর ফিরিস্তি অভিযোগ রয়েছে, সিন্ডিকেটের দাপটে ব্যবসায়ীদের নাভিশ্বাস উঠত। বাইপাস সংলগ্ন ৩০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পে প্রায় ৩ কোটি টাকা তোলাবাজি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্বাস্থ্য পরিষেবা সংক্রান্ত একটি প্রকল্পে প্রতি কংক্রিট কন্টেইনারের জন্য ১,২০০ টাকা পর্যন্ত ‘ফি’ দিতে হতো। রিয়েল এস্টেট সংস্থাগুলোর মতে, আবাসন প্রকল্পে প্রতি বর্গফুটে ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ চাপানো হতো, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ফ্ল্যাট ক্রেতাদের ওপরই পড়ত।
সাধারণ মানুষের ভোগান্তি শুধু বড় নির্মাণ সংস্থা নয়, সাধারণ মানুষের ছোটখাটো মেরামতির কাজও সিন্ডিকেটের নজর এড়াত না। পাটুলির এক প্রবীণ দম্পতি বাড়ি রং করার সময় তোলাবাজদের হুমকির মুখে পড়েছিলেন। নতুন বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালীদের প্রতি বর্গফুটে ৩০ টাকা পর্যন্ত দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
মূল কাঠামো কি ভাঙবে? কলকাতা ও বিধাননগর এলাকায় অন্তত ১২ জন কাউন্সিলর তোলাবাজি ও ভয় দেখানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে সমালোচকদের একাংশ মনে করছেন, মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ছোট ছোট সিন্ডিকেট চক্রগুলো এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। শিল্পমহলের আশঙ্কা, পুরনো সিন্ডিকেট সদস্যরা যদি নতুন রাজনৈতিক রঙের সাথে মিশে যায়, তবে এই পরিবর্তনের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
রাজ্য সরকারের এক প্রবীণ মন্ত্রীর মতে, বিনিয়োগ টানতে হলে এই তোলাবাজির সংস্কৃতি চিরতরে উপড়ে ফেলা জরুরি। তবে বাস্তব পরিবর্তন কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তা দেখার জন্য এখন অপেক্ষায় রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।