TMC-র ভাঙন কি অনিবার্য? দলত্যাগ-বিরোধী আইনের জালে কি আটকে যাবেন বিদ্রোহীরা?

তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে বিদ্রোহী সাংসদদের ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েন্স পার্টি অব ইন্ডিয়া (NCPI)-তে যোগ দেওয়ার জল্পনা এখন রাজনৈতিক মহলের আলোচনার কেন্দ্রে। প্রশ্ন উঠছে, দলত্যাগ-বিরোধী আইন বা ‘অ্যান্টি-ডিফেকশন ল’ (দশম তফসিল) অনুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে কি কোনো পদক্ষেপ করা সম্ভব? নাকি সংখ্যার জোরে তৃণমূলের ওপরই অধিকার কায়েম করতে পারেন বিদ্রোহীরা?

আইনের মারপ্যাঁচ: ১৯৮৫ সালে রাজীব গান্ধীর আমলে প্রবর্তিত দলত্যাগ-বিরোধী আইনে ২০০৩ সালে অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমলে ৯১তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বড় পরিবর্তন আনা হয়। আইন অনুযায়ী, কোনো দলের সাংসদরা যদি অন্য কোনো দলে মিশে যেতে চান, তবে তাঁদের সংখ্যার অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন থাকা আবশ্যক। এই শর্ত পূরণ হলে তবেই তাঁরা দলত্যাগের আইনি অভিযোগ থেকে রেহাই পেতে পারেন।

সংখ্যার খেলা: বর্তমানে লোকসভায় তৃণমূলের সাংসদ সংখ্যা ২৮। সেই হিসেবে আইনত ভাঙন বা দলবদলের জন্য কমপক্ষে ১৯ জন সাংসদের সমর্থন প্রয়োজন। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, তাঁদের সঙ্গে ইতিমধ্যেই ২০ জন সাংসদ রয়েছেন এবং আরও ২ জন সমর্থন করার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ, বিদ্রোহী শিবিরের দাবি অনুযায়ী সংখ্যাটি ২২-এ পৌঁছাতে পারে। এই যুক্তি খাড়া করেই বিদ্রোহীরা মনে করছেন, তাঁরা আইনত সুরক্ষিত এবং তাঁদের সদস্যপদ খারিজ হওয়ার কোনো কারণ নেই।

নির্বাচন কমিশনের লড়াই: তবে কেবল সদস্যপদ রক্ষা নয়, দল ও প্রতীকের মালিকানা নিয়ে লড়াইটি হবে সম্পূর্ণ আলাদা। সাংসদ পদ বজায় রাখার আইনি জটিলতা এক বিষয়, আর তৃণমূলের ‘আসল উত্তরাধিকারী’ কে, তা নির্ধারণ করা অন্য বিষয়। নির্বাচন কমিশন দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, সাংগঠনিক কাঠামো এবং দলীয় সংবিধানের অভ্যন্তরীণ সমর্থনের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।

  • মমতা ফ্যাক্টর: তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামোর ওপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এখনও দলের সবচেয়ে বড় শক্তি। বিদ্রোহীরা সংখ্যাতত্ত্বের সুবিধা পেলেও, তৃণমূলের তৃণমূল স্তরের সংগঠনের সমর্থন কার দিকে থাকবে, সেটিই হবে আগামী দিনের মূল চ্যালেঞ্জ।

  • ভবিষ্যৎ পথ: বিদ্রোহীরা স্পিকারের কাছে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অন্যদিকে, তৃণমূলের অন্দরেও এই ভাঙন ঠেকাতে কৌশল তৈরি হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই লড়াই শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের দরজায় গিয়ে ঠেকতে পারে।

সংবিধানের দশম তফসিলের এই জটিল সমীকরণ ও রাজনৈতিক কৌশলের লড়াই শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের ওপর অধিকার বজায় থাকে, নাকি নতুন দলের আড়ালে তৃণমূলের ক্ষমতার দখল বদলে যায়—তাই এখন বড় প্রশ্ন।