২১ জনের মৃত্যুর পর ঘুম ভাঙল সরকারের! দিল্লির সেই অভিশপ্ত ‘কিলিং জোন’ হোটেলের জেরে চিরতরে বন্ধ ঐতিহাসিক প্রকল্প!

দিল্লির মালভিয়া নগরের ‘ফ্লারিশ স্টে’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১১ জন বিদেশী নাগরিকসহ ২১ জন নিরীহ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর নড়েচড়ে বসল প্রশাসন। এই কোলশিয়ারিং ও অবৈধ হোটেল ব্যবসার রমরমা রুখতে এবার এক ঐতিহাসিক ও কঠোর পদক্ষেপ নিল দিল্লি সরকার। রাজধানীর বুকে দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে চলা ঐতিহ্যবাহী ‘বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট’ (B&B) প্রকল্পটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘোষণা করেছেন দিল্লির পর্যটন মন্ত্রী কপিল মিশ্র। একই সাথে এই প্রকল্পের অধীনে থাকা সমস্ত আবাসন ও হোম-স্টেগুলি স্ক্রিনারের আওতায় এনে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৬টি ঘরের লাইসেন্স, চলছিল ২৫টি রুম! প্রশাসনের চোখে ধুলো
তদন্তকারীদের প্রকাশ করা চাঞ্চল্যকর তথ্যের পরই এই বড় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে পর্যটন দফতর। জানা গেছে, ফ্লারিশ স্টে হোটেলটিকে ২০২৪ সালে এই বিঅ্যান্ডবি (BnB) প্রকল্পের অধীনে ‘সিলভার ক্যাটাগরি’-তে মাত্র ৬টি ঘর চালানোর আইনি অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যার মেয়াদ ছিল ২০২৭ সাল পর্যন্ত। কিন্তু অতিরিক্ত মুনাফার লোভে হোটেল মালিক নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে বেসমেন্টসহ পুরো ভবনে ২৫টিরও বেশি ঘর বানিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছিল। বাধ্যতামূলক অগ্নিনির্বাপণ ছাড়পত্র (Fire NOC) ছাড়াই অনুমোদিত ক্ষমতার চেয়ে চারগুণ বেশি অতিথিকে সেখানে রাখা হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত ২১ জনের জন্য মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
নিয়ম ভাঙলে লাইসেন্স বাতিল ও কড়া আইনি পদক্ষেপ: কপিল মিশ্র
পর্যটন মন্ত্রী কপিল মিশ্র স্পষ্ট জানিয়েছেন, “আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট প্রকল্প প্রত্যাহার করছি এবং এর অধীনে লাইসেন্সপ্রাপ্ত সমস্ত প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করব।” তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যেসব আবাসন বা হোটেল চালক লাইসেন্সের শর্তাবলী লঙ্ঘন করে ৬টির বেশি ঘর বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছেন, তাঁদের লাইসেন্স অবিলম্বে বাতিল করা হবে এবং ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হবে। তিনি আরও খোলসা করেন যে, পর্যটন বিভাগের কাজ মূলত লাইসেন্স প্রদান ও নিয়মাবলী যাচাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং প্রতি ১৫ দিন অন্তর স্থানীয় থানায় অতিথিদের রেকর্ড জমা দেওয়া হোটেল মালিকদের আইনি বাধ্যবাধকতা।
কী এই ‘বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট’ প্রকল্প? কেন শুরু হয়েছিল?
২০০৭ সালে দিল্লির তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিতের আমলে এই জনপ্রিয় প্রকল্পটির সূচনা হয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বিদেশি ও ভিনরাজ্যের পর্যটকদের হোটেলের চেয়ে কম খরচে, নিরাপদ এবং পারিবারিক পরিবেশে ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় বাড়িতে থাকার সুযোগ করে দেওয়া। যেখানে পর্যটকেরা ঘরের তৈরি সুস্বাদু খাবারসহ ভারতীয় সংস্কৃতির স্বাদ পেতেন।
শুরু থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দিল্লির প্রায় ৪৩২টি বিলাসবহুল সম্পত্তির ২,২০০টিরও বেশি ঘর এই প্রকল্পের অধীনে নিবন্ধিত হয়েছিল। বাড়িওয়ালারা যাতে সহজেই নিজেদের অতিরিক্ত ঘর ভাড়া দিতে পারেন, তার জন্য ২০২১ সালের সংশোধনীতে রেজিস্ট্রেশনের সময়সীমা ৩ মাস থেকে কমিয়ে মাত্র ৩০ দিন করা হয়েছিল।
বাড়িওয়ালার সামনে ছিল ৩৬টি কড়া শর্তের বেড়াজাল
এই প্রকল্পের নিয়মকানুন এমনিতে অত্যন্ত কড়া ছিল। সরকারি পরিদর্শনের পর আবাসন ও সুযোগ-সুবিধার ওপর ভিত্তি করে ঘরগুলিকে ‘গোল্ড’ (ফি ৫,০০০ টাকা) এবং ‘সিলভার’ (ফি ৩,০০০ টাকা) ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হতো। গোল্ড ক্যাটাগরির জন্য ভালো পার্কিং, ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা রক্ষী, ওয়াশিং মেশিন ও রেফ্রিজারেটরের মতো সুবিধা বাধ্যতামূলক ছিল।
এই লাইসেন্সের মেয়াদ থাকে মাত্র ৩ বছর এবং প্রতিবার নতুন করে আবেদন করতে হয়। নিয়মানুযায়ী, বাড়ির মালিককে সশরীরে ওই একই বাড়িতে বসবাস করতে হবে এবং তিনি নিজের শোওয়ার ঘরের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি বা সর্বোচ্চ ৬টির বেশি ঘর কোনোভাবেই ভাড়া দিতে পারবেন না। প্রতিটি ঘরে নিজস্ব শৌচাগার, ২৪ ঘণ্টা গরম ও ঠান্ডা জলের জোগান, ইন্টারনেট, টেলিফোন এক্সটেনশন এবং টেবিল-চেয়ার থাকা বাধ্যতামূলক— এমন মোট ৩৬টি শর্ত দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু ফ্লারিশ স্টে-র মতো বহু প্রতিষ্ঠান এই মানবিক ও পর্যটন-বান্ধব প্রকল্পের সুযোগ নিয়ে দিল্লির বুকে দেদার বেআইনি ও বিপজ্জনক ‘কিলিং জোন’ হোটেল ব্যবসা ফেঁদে বসেছিল। আর সেই কারণেই সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই পুরো প্রকল্পটিতেই স্থায়ীভাবে তালা ঝোলাল দিল্লি সরকার।