হিজবুল্লাহকে হটিয়ে লেবাননে ‘নো-এন্ট্রি জোন’! ট্রাম্পের ১টি ফোনেই কি যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন নেতানিয়াহু?

মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী সংঘাতে এক বড়সড় মোড়। অবশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দীর্ঘ চতুর্থ দফা ম্যারাথন আলোচনার পর এক ঐতিহাসিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি নবায়ন করতে সম্মত হয়েছে ইসরায়েল ও লেবানন। এই চুক্তির সবচেয়ে বড় এবং চমকপ্রদ সিদ্ধান্ত হলো— লেবাননের অভ্যন্তরে একটি বিশেষ ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ (Security Zone) গড়ে তোলা হবে, যেখানে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের বসবাস বা যেকোনো ধরণের সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা থাকবে।

লিতানি নদী ছাড়তে হবে হিজবুল্লাহকে, নিয়ন্ত্রণে থাকবে লেবানন সেনা
দুই দেশের পক্ষ থেকে জারি করা এক যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, হিজবুল্লাহ যদি লিতানি নদীর দক্ষিণ প্রান্তের এলাকা থেকে ইসরায়েলের ওপর সমস্ত রকম রকেট ও ড্রোন হামলা বন্ধ করে এবং সেখান থেকে তাদের সমস্ত লড়াকু যোদ্ধাদের পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেয়, তবেই এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকবে। এই বিশেষ নিরাপত্তা অঞ্চলগুলো কীভাবে মানচিত্রায়িত করা হবে তা এখনও বিস্তারিত খোলসা করা না হলেও, চুক্তিতে বলা হয়েছে যে এই এলাকাগুলোর ওপর পূর্ণ প্রশাসনিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ থাকবে একমাত্র লেবানন সেনাবাহিনীর। সেখানে নিরাপত্তা বজায় রাখার পাশাপাশি হিজবুল্লাহর অনুপ্রবেশ ঠেকানোর দায়িত্বও থাকবে দেশের সেনার ওপর।

ইঙ্গিত কি তেহরানের দিকে? ইরানকে পরোক্ষ বার্তা ইসরায়েল-লেবাননের
এই যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশই জোর দিয়ে বলেছে যে, এই পদক্ষেপগুলো আগামী দিনে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা চুক্তি গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বিবৃতিতে বলা হয়েছে— লেবাননের ভবিষ্যৎ শুধুমাত্র দেশটির নিজস্ব বৈধ সরকার এবং ইসরায়েলি সরকার দ্বারাই নির্ধারিত হওয়া উচিত। কোনো বাইরের দেশ বা তৃতীয় শক্তির এতে নাক গলানোর অধিকার নেই।

কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বার্তাটি সরাসরি ইরানের প্রতি এক পরোক্ষ চপেটাঘাত। কারণ ইরানই হিজবুল্লাহর প্রধান অর্থ ও অস্ত্র জোগানদার। এর আগে ইরান লেবাননের ওপর ইসরায়েলি হামলা বন্ধের দাবি জানালেও, এই শান্তি আলোচনাগুলোতে হিজবুল্লাহকে সম্পূর্ণ বাইরে রাখা হয়েছিল।

চুক্তির মাঝেই ড্রোন হামলা! তেহরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি
কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি চুক্তির কথা বলা হলেও, যুদ্ধক্ষেত্রের মাটি কিন্তু এখনও গরম। বুধবারই দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোনের এক বিধ্বংসী হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন। লেবাননের নিরাপত্তা আধিকারিকদের দাবি, বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে একটি যাত্রীবাহী গাড়িকে লক্ষ্য করেও হামলা চালানো হয়েছে।

অন্যদিকে, ইসরায়েল দাবি করেছে যে তারা হিজবুল্লাহর একটি সন্দেহভাজন আকাশী লক্ষ্যবস্তু আকাশেই ধ্বংস করে দিয়েছে। এই পরিস্থিতির মাঝেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইসরায়েল যদি বৈরুতে পুনরায় বড় কোনো হামলা চালায়, তবে ইরান তার যোগ্য ও কঠোর জবাব দেবে।

নেতানিয়াহুকে ট্রাম্পের ফোন: “যুদ্ধ বন্ধ করুন”
এই পুরো ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির নেপথ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বড় ভূমিকা সামনে এসেছে। ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছেন যে, যুদ্ধ চলাকালীন তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সরাসরি ফোন করেছিলেন এবং লেবাননে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করার কড়া আহ্বান জানিয়েছিলেন।

এই বিষয়ে মুখ খুলেছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীও। নেতানিয়াহু জানান, কিছু বিষয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সামান্য মতপার্থক্য থাকলেও, লেবানন থেকে হিজবুল্লাহর মূলোৎপাটন এবং ইরানের আগ্রাসন রোখার বিষয়ে দুই দেশের দৃষ্টিভঙ্গি ও লক্ষ্য একেবারেই এক। এখন দেখার, এই নতুন চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ফেরাতে পারে নাকি আবারও বারুদের গন্ধে কেঁপে ওঠে বৈরুত।