গ্যারেজ থেকে বিশ্বজয়, তারপর ১৫ লক্ষ কোটির জালিয়াতি! ভারতের ‘গোল্ড কিং’-এর পতনে কাঁপছে শেয়ার বাজার!

একসময় যে মানুষটির আঙুলের ইশারায় উঠত-বসত দেশের সোনার বাজার, যাঁর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য ছড়িয়ে রয়েছে সুইজারল্যান্ড থেকে দুবাই— সেই ভারতের ‘গোল্ড কিং’ তথা বিশিষ্ট উদ্যোগতি রাজেশ মেহতা এখন খাদের কিনারায়। গত ৩ জুন সন্ধ্যায় দেশের বাজার নিয়ামক সংস্থা সেবি (SEBI) আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে রাজেশ এক্সপোর্টস এবং এর প্রোমোটার রাজেশ মেহতার ওপর এক ঐতিহাসিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। আর এই খবরের জেরেই আজ, ৪ জুন সকালে বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে কোম্পানির শেয়ার। ৫% লোয়ার সার্কিট ছুঁয়ে শেয়ারের দাম এসে ঠেকেছে ১০৩.৯২ টাকায়।

কী এই ১৫.১৫ লক্ষ কোটি টাকার মেগা স্ক্যাম?
সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়া (SEBI)-র পেশ করা তথ্য দেখে চক্ষু চড়কগাছ বাজার বিশেষজ্ঞদের। অভিযোগ, ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের মধ্যে রাজেশ এক্সপোর্টস লিমিটেড কোনো ব্যবসা না করেই খাতায়-কলমে প্রায় ১৫.১৫ লক্ষ কোটি টাকার ভুয়া রাজস্ব বা আয় বাড়িয়ে দেখিয়েছে! এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কোম্পানির ঘোষিত মোট মূল্যের প্রায় ৯৯.৮০ শতাংশ। অর্থাৎ, সহজ ভাষায় বলতে গেলে, কোম্পানির প্রায় পুরো আয়টাই ছিল স্রেফ কাগজ-কলমের কারসাজি। শুধু তাই নয়, তদন্তের সময় সেবি-কে কোনো রকম সহযোগিতা না করারও মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে এই সংস্থার বিরুদ্ধে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে সেবি অবিলম্বে রাজেশ মেহতা ও তাঁর কোম্পানিকে শেয়ার বাজারে লেনদেন করা থেকে নিষিদ্ধ করেছে এবং পুরো বিষয়টির ওপর একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ ‘ফরেনসিক অডিট’-এর নির্দেশ দিয়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার ‘গোল্ড কিং’-এর, আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি
অবশ্য এই সমস্ত অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য বলে দাবি করেছেন খোদ রাজেশ মেহতা। একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, এটি কেবল একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ। কোম্পানি পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং খুব শীঘ্রই সেবি-কে এর আইনি জবাব দেওয়া হবে। তবে মেহতা আইনি লড়াইয়ের কথা বললেও, বিনিয়োগকারীদের ভরসা পুরোপুরি ডগমগ। তড়িঘড়ি নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে বাঁচতে চাইছেন সাধারণ মানুষ।

সিনেমার গল্পকেও হার মানায় উত্থানের কাহিনী
আজ যিনি কাঠগড়ায়, তাঁর সাফল্যের ইতিহাস কিন্তু রূপকথার চেয়ে কম ছিল না। ১৯৮৯ সালে ভাই প্রশান্ত মেহতার সঙ্গে হাত মিলিয়ে চেন্নাই থেকে সোনা কিনে রাজকোটে বিক্রি করার মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করেন রাজেশ। এরপর বেঙ্গালুরুর একটা ছোট্ট গ্যারেজ ভাড়া নিয়ে শুরু হয় সোনার গয়না তৈরির কাজ।

নিজেদের কঠোর পরিশ্রম ও দূরদর্শিতার জোরে সেই গ্যারেজের ব্যবসাই ডালপালা মেলে পৌঁছে যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দুবাই, ওমান, কুয়েত এবং সমগ্র ইউরোপের বাজারে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসের হিসাব অনুযায়ী, কোম্পানিটির রাজস্বের পরিমাণ ছিল ২,৫১৬ কোটি টাকা।

বিশ্বের বৃহত্তম সোনা শোধনাগার ও ফোর্বসের তালিকায় নাম
রাজেশ মেহতার মুকুটে আসল পালকটি যুক্ত হয় ২০১৫ সালে। সুইস স্বর্ণ পরিশোধনকারী জায়ান্ট ‘ভ্যালক্যাম্বি এসএ’ (Valcambi SA) অধিগ্রহণ করে রাতারাতি বিশ্বমঞ্চের লাইমলাইটে চলে আসেন তিনি। ভারত, সুইজারল্যান্ড ও দুবাই— তিন দেশ জুড়ে বিস্তৃত এই কোম্পানির বার্ষিক ২,৪০০ টন সোনা পরিশোধন করার ক্ষমতা রয়েছে। এই আকাশছোঁয়া সাফল্যের জেরেই ২০১৯ সালে বিশ্বখ্যাত ম্যাগাজিন ‘ফোর্বস’ রাজেশ মেহতাকে বিশ্বের অন্যতম ধনকুবের হিসেবে ঘোষণা করে, যাঁর মোট সম্পত্তির পরিমাণ ছিল ১.৫৭ বিলিয়ন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৪,৯১৫ কোটি টাকা)।

কিন্তু কয়েক দশক ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা এই বিশ্বাসের সাম্রাজ্য কি তবে স্রেফ কাগজী জালিয়াতির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল? সেবির এই পদক্ষেপ দেশের কর্পোরেট জগতে এক মস্ত বড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিল।