NIA হানার মুখে প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক শওকত মোল্লা! ভাঙড়ে তোলপাড়ের মাঝেই বড় বার্তা মন্ত্রী তাপস রায়ের

ভোট পরবর্তী বা প্রাক-নির্বাচনী হিংসা এবং বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার তদন্তে এবার আরও আক্রমণাত্মক মেজাজে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ (NIA)। এবার খোদ প্রাক্তন তৃণমূল (TMC) বিধায়ক শওকত মোল্লার বাড়িতে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের আকস্মিক হানা ও ম্যারাথন তল্লাশি ঘিরে চরম উত্তেজনা ছড়াল দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ে। এই হাই-প্রোফাইল অভিযানের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার দলের প্রাক্তন বিধায়কের বিরুদ্ধে এনআইএ-র এই পদক্ষেপকে কার্যত পরোক্ষভাবে সমর্থন করে বসলেন রাজ্যের মন্ত্রী তাপস রায়, যা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন শুরু হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সংবাদসংস্থা এএনআই (ANI)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শওকত মোল্লার বাড়িতে এনআইএ তল্লাশি প্রসঙ্গে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন মন্ত্রী তাপস রায়। তিনি সাফ জানান, “আইনি মামলায় যার নামই জড়াবে, তাকে তদন্তের স্বার্থে এজেন্সিকে সহযোগিতা করতেই হবে। কেন্দ্রীয় সংস্থা তলব করলে হাজিরা দেওয়াটাও বাধ্যতামূলক।” নিজের বক্তব্যের পরিধি আরও স্পষ্ট করে মন্ত্রী বলেন, “যেখানেই মামলা হোক বা যে-ই এই ধরণের ঘটনায় জড়িত থাকুক না কেন, তাকে অনিবার্যভাবে ডাকা হবে এবং সেখানে হাজিরা দিতেই হবে।”

ভাঙড়ের দক্ষিণ বামুনিয়ায় সাতসকালে এনআইএ হানা:
বিশ্বস্ত সূত্রে খবর, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে ভাঙড় এলাকায় একটি ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল, যে ঘটনায় একজন সাধারণ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে স্থানীয় স্তরে কেন্দ্রীয় তদন্তের জোরালো দাবি ওঠায় পুরো মামলাটির তদন্তভার নিজেদের হাতে নেয় এনআইএ। তদন্তভার নেওয়ার পর থেকেই কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা এই মামলায় কোমর বেঁধে নেমেছেন এবং ইতিমধ্যেই তৃণমূল নেতা ওয়াহিদুল ইসলাম-সহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।

এই চলমান তদন্তের সূত্র ধরেই বৃহস্পতিবার সকালে ভাঙড়ের দক্ষিণ বামুনিয়া এলাকায় প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক শওকত মোল্লার বাড়িতে হানা দেয় এনআইএ-র একটি বিশেষ দল। বাড়ি জুড়ে যখন কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে ঘিরে তল্লাশি ও তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছিল, ঠিক সেই সময়ই শওকত মোল্লার স্ত্রী ও মেয়েকে তড়িঘড়ি বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতে দেখা যায়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোটা ভাঙড় জুড়ে নতুন করে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

কবরস্থানের পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে ৭৯টি তাজা বোমা উদ্ধার, নতুন এফআইআর দায়ের:
ভাঙড়ের এই পুরোনো মামলার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে বিপুল পরিমাণ তাজা বোমা উদ্ধারের একটি পৃথক মামলাও এবার নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি। এই ঘটনার পেছনে কোনও বড়সড় সন্ত্রাসবাদী যোগ বা গভীর চক্রান্তের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের (MHA) সবুজ সংকেত ও কড়া নির্দেশ পাওয়ার ঠিক একদিন পরই, সোমবার সকালে এনআইএ-র তরফে একটি নতুন ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট বা এফআইআর (RC-25/2026/NIA/DLI) দাখিল করা হয়েছে। এনআইএ-র আধিকারিকরা জানিয়েছেন, “স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশেই এই তাজা বোমা উদ্ধারের মামলাটি আমরা হাতে নিয়েছি। এর আগে গত ২৫ এপ্রিল গোপন সূত্রে খবর পেয়ে কলকাতার ভাঙড় ডিভিশনের উত্তর কাশীপুর থানার পুলিশ মাঝেরহাট (পয়লেপাড়া) গ্রামের একটি কবরস্থানের কাছের পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে পাটের দড়ি দিয়ে বাঁধা ৭৯টি শক্তিশালী তাজা বোমা এবং অন্যান্য আপত্তিকর বিস্ফোরক সামগ্রী উদ্ধার করেছিল।”

জনসাধারণের জীবন ও সম্পত্তির জন্য চরম বিপজ্জনক এই বিস্ফোরক মজুতের ঘটনায় প্রথমে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS), ২০২৩ এবং এক্সপ্লোসিভ সাবস্ট্যান্সেস অ্যাক্ট, ১৯০৮-এর একাধিক ধারায় রাজ্য পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা (FIR No. 62/2026) রুজু করেছিল। কিন্তু ঘটনার গুরুত্ব ও আন্তর্জাতিক যোগসূত্র খতিয়ে দেখতে গত ২৬ এপ্রিল এনআইএ আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন মামলা নথিভুক্ত করে তদন্ত শুরু করেছে। একদিকে শওকত মোল্লার বাড়িতে হানা, অন্যদিকে ৭৯টি তাজা বোমার মামলার তদন্তভার— সব মিলিয়ে উত্তর কাশীপুর ও ভাঙড় এলাকায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর বুটের শব্দে এক থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।