২৫ বছর পর প্রেক্ষাগৃহে ফিরছে ‘লগান’! অস্কারজয়ী সেই ইতিহাস নতুন ট্রেলারে ফের কাঁপাল নেটদুনিয়া

ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এমন কিছু ছবি রয়েছে, যেগুলি শুধু বক্স অফিসের সাফল্য নয়, বরং এক একটি যুগের জীবন্ত দলিল। সেই তালিকায় অন্যতম উজ্জ্বল তথা মাইলফলক নাম ‘লগান: ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ইন্ডিয়া’। মুক্তির দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও এই কালজয়ী ছবির আবেদন আজও এতটুকু ম্লান হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সিনেমা প্রেমীদের হৃদয়ে এর গভীরতা আরও বেড়েছে। এবার সেই আবেগ, সেই টানটান উত্তেজনা এবং গৌরবের ইতিহাসকে আবারও বড়পর্দায় ফিরিয়ে আনতে চলেছে আমির খান প্রোডাকশনস।

ছবিটির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আগামী ১২, ১৩ এবং ১৪ জুন দেশের বাছাই করা প্রেক্ষাগৃহে পুনর্মুক্তি পেতে চলেছে ‘লগান’। আর এই বিশেষ পুনর্মুক্তির মুহূর্তকে সামনে রেখে সমাজমাধ্যমে মুক্তি পেয়েছে ছবির একটি সম্পূর্ণ নতুন ট্রেলার, যা ইতিমধ্যেই আসমুদ্রহিমাচল দর্শকের মনে নস্ট্যালজিয়ার এক প্রবল ঢেউ তুলেছে।

নতুন ট্রেলারটি যেন এক অদ্ভুত আবেগঘন টাইম মেশিন। দর্শককে নিমেষের মধ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ২৫ বছর আগের সেই সোনালী সময়ে, যখন থিয়েটারে প্রথমবার বিশ্বরেকর্ড গড়েছিল এই ছবি। ট্রেলারের প্রতিটি ফ্রেমে নতুন করে ধরা পড়েছে ছবির অনবদ্য চিত্রনাট্য, গ্রামীণ ভারতের সরল জীবনযাত্রা, পরাধীন দেশের সামাজিক বাস্তবতা এবং ব্রিটিশ শাসনের অত্যাচারী প্রেক্ষাপট। একই সঙ্গে প্রেম, গভীর বন্ধুত্ব, কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় একতা, আত্মবিশ্বাস এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার লড়াইয়ের মতো চিরন্তন উপাদানগুলি এই ছবিকে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।

এর সঙ্গে বাড়তি পাওনা হিসেবে যোগ হয়েছে সংগীত পরিচালক এ. আর. রহমানের সুরে তৈরি সেই অবিস্মরণীয় আবহ সংগীত, যা আজও রোমকূপ খাড়া করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বিজয়ের উল্লাস, স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং ক্রিকেট পিচের সেই লড়াইয়ের রোমাঞ্চে ভরপুর ট্রেলারটি যেন আবারও প্রমাণ করে দিল যে কেন ‘লগান’ ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম সেরা সৃষ্টি। ফলে আগামী ১২ থেকে ১৪ জুনের এই বিশেষ প্রদর্শনীকে ঘিরে সিনেপ্রেমীদের আগ্রহ এখন তুঙ্গে।

২০০১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই মাস্টারপিস ছবিটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন জাদুকর পরিচালক আশুতোষ গোয়ারিকর। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে আমির খানের কালজয়ী অভিনয় আজও মানুষের মনে গেঁথে রয়েছে। তাঁর পাশাপাশি এই ছবিতে গ্রেসি সিং, র‍্যাচেল শেলি, পল ব্ল্যাকথর্ন, সুহাসিনী মুলে, কুলভূষণ খারবন্দা, রঘুবীর যাদব, রাজেশ বিবেক, প্রদীপ রাওয়াত, যশপাল শর্মা এবং প্রয়াত এ. কে. হাঙ্গাল-সহ একঝাঁক প্রতিভাবান শিল্পী নিজেদের সেরা অভিনয় উজার করে দিয়েছিলেন। এ. আর. রহমানের জাদুকরী ছোঁয়ায় তৈরি ‘ঘনন ঘনন’, ‘মিতওয়া’, ‘রাধা ক্যায়সে না জলে’ বা ‘ও রে ছোরি’র মতো গান আজও ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতের অন্যতম অমূল্য সম্পদ।

গল্পের পটভূমি ১৮৯৩ সালের ব্রিটিশ শাসিত মধ্য ভারতের এক প্রত্যন্ত গ্রাম। খরা আর ইংরেজদের অত্যধিক করের (লগান) চাপে যখন গ্রামবাসীদের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার জোগাড়, ঠিক তখনই তাঁদের সামনে এক অদ্ভুত ও অসম চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় এক অহংকারী ব্রিটিশ অফিসার। শর্ত দেওয়া হয়— ক্রিকেট ম্যাচে ইংরেজদের হারাতে পারলে আগামী তিন বছরের জন্য কর মকুব করা হবে, আর হেরে গেলে দিতে হবে তিনগুণ লগান। যে খেলার নিয়মকানুনই গ্রামবাসীদের জানা নেই, সেই ক্রিকেট শিখে ব্রিটিশদের অহংকার গুঁড়িয়ে দেওয়ার এক অবিশ্বাস্য লড়াইয়ের গল্পই হলো ‘লগান’।

শুধু দেশের মাটিতেই নয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চেও ভারতের পতাকা সগর্বে উড়িয়েছিল এই ছবি। বিশ্বের একাধিক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত ও পুরস্কৃত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বখ্যাত ‘একাডেমি অ্যাওয়ার্ডস’ বা অস্কারের সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়ে ইতিহাস গড়েছিল ‘লগান’। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ভারতের শেষ চলচ্চিত্র হিসেবে এটিই অস্কারের ওই মূলমঞ্চে মনোনয়ন পাওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল। এছাড়াও ৪৯তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের মঞ্চে সেরা জনপ্রিয় চলচ্চিত্র-সহ একযোগে আটটি জাতীয় পুরস্কার জিতে নিয়েছিল আমির খানের এই ঐতিহাসিক ছবি। ২৫ বছর পর বড়পর্দায় সেই ক্রিকেট ম্যাচ আবার দেখার জন্য কাউন্টডাউন শুরু করে দিয়েছেন দর্শকেরা।