“হোরমুজ উত্তাপেই বাজিমাত ভারতের!”-বিশ্ববাজারের সঙ্কটকে অস্ত্র বানিয়ে কীভাবে তেল কূটনীতিতে জয়ী নয়াদিল্লি?

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা এবং হোরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক শিপিংয়ের চরম অচলাবস্থায় যখন বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে ত্রাহি ত্রাহি রব, তখন ভারত এক অসাধ্য সাধন করে ফেলেছে। যুদ্ধের এই মহাসঙ্কটকে সুযোগে পরিণত করে ভারত কেবল নিজের জ্বালানি সুরক্ষা নিশ্চিত করেনি, বরং বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন কৌশলী খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
‘অ্যানি ক্রুড স্ট্র্যাটেজি’: ভারতের নতুন তুরুপের তাস অতীতে ভারত মূলত পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর নির্দিষ্ট কিছু তেলের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু হোরমুজ সঙ্কটের জেরে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় ভারত তার নীতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছে। দেশের তেল শোধনাগারগুলোকে এমনভাবে আধুনিকীকরণ করা হয়েছে যে, এখন যে কোনো ধরনের—হালকা, ভারী, মিষ্টি কিংবা টক (Sour)—অপরিশোধিত তেল শোধন করার সক্ষমতা ভারতের হাতের মুঠোয়। একেই বলা হচ্ছে ‘অ্যানি ক্রুড স্ট্র্যাটেজি’ (Any Crude Strategy)। এর ফলে নির্দিষ্ট কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমেছে এবং ভারত নিজের শর্তে তেল কেনার ক্ষমতা অর্জন করেছে।
সস্তার রুশ তেলে রেকর্ড আমদানি ২০২৬ সালের মে মাসে ভারত রুশ তেল আমদানির ক্ষেত্রে এক সর্বকালীন রেকর্ড গড়েছে—প্রতিদিন ২.১৭ মিলিয়ন ব্যারেল। আন্তর্জাতিক বাজারে চীন তেল আমদানি কমিয়ে দেওয়ায় ভারতের জন্য সস্তায় ভালো মানের তেলের কার্গো পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভারতের অত্যাধুনিক শোধনাগারগুলো সবচেয়ে সস্তা ও নিম্নমানের ভারী ক্রুড কিনে তা থেকে পেট্রোল, ডিজেল এবং জেট ফুয়েলের মতো উচ্চমূল্যের জ্বালানি তৈরি করছে, যা ভারতের মুনাফার মার্জিন একলাফে অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে।
ঝুঁকি সামলে বিকল্পের পথে ভারত হোরমুজ প্রণালী ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ায় ভারত এখন আফ্রিকা, রাশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর দিকে নজর দিয়েছে। সরকার ও তেল সংস্থাগুলো বর্তমানে স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ বা কৌশলগত তেলের ভাণ্ডার মজুত রাখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। একইসঙ্গে অভ্যন্তরীণ রিফাইনিং সক্ষমতা বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তৎপর নয়াদিল্লি।
যদিও তেলের চাহিদার জন্য ভারত এখনও আমদানির ওপরই নির্ভরশীল, তবুও প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণ ও সময়োচিত কূটনৈতিক পদক্ষেপে বিশ্ববাজারে ভারত এখন এক শক্তিশালী ও দক্ষ জ্বালানি শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।