রেড রোডে লাল আলো দেখে ব্রেক কষলেন মুখ্যমন্ত্রী! ট্রাফিক ডিসি-কে ডেকে সোজা কী নির্দেশ দিলেন শুভেন্দু?

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় মানেই রাজপথে দীর্ঘ গাড়ির পাইলট, ট্রাফিক সিস্টেমে বাড়তি সুবিধা এবং সাধারণ মানুষের পথ আটকে ভিভিআইপিদের মসৃণ যাতায়াত—এটাই গত কয়েক দশকে বাংলার চেনা ছবি। কিন্তু নবান্নের মসনদে বসেই এই চেনা ভিআইপি সংস্কৃতি এক ঝটকায় বদলে দিতে চাইছেন রাজ্যের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বুঝিয়ে দিলেন, সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে কোনো বাড়তি সুবিধা তিনি নেবেন না। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রেড রোডে ঘটে যাওয়া একটি নজিরবিহীন ঘটনা তারই প্রমাণ দিল।
মাঝরাস্তায় আচমকা ব্রেক! রেড রোডে স্তম্ভিত পুলিশ
মঙ্গলবার সাড়ে ৬টা নাগাদ গোধূলির আলো মেখে রেড রোড হয়ে ময়দানের পিডব্লিউডি (PWD) টেন্টের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল নতুন মুখ্যমন্ত্রীর কনভয়। সেখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বৈঠক হওয়ার কথা ছিল তাঁর। স্বভাবতই রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের গাড়ি আসছে দেখে ট্রাফিক ক্লিয়ার করার তৎপরতা শুরু হয়। সিগন্যাল সবুজ না-থাকলেও, চিরাচরিত প্রোটোকল মেনে তড়িঘড়ি ভিআইপি গাড়িগুলি ছেড়ে দেওয়ার তোড়জোড় করছিলেন কর্তব্যরত কলকাতা পুলিশের এক পদস্থ ডেপুটি কমিশনার (DC)।
কনভয় এগোচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু আইন ভেঙে সিগন্যাল লাল থাকা অবস্থাতেই তাঁর গাড়িকে পার করানোর চেষ্টা হচ্ছে—এই বিষয়টি নজরে আসতেই মাঝরাস্তায় হঠাৎ ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ে মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি। আচমকা ভিভিআইপি গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আধিকারিকরা হকচকিয়ে যান।
“দরকারে ঘুরিয়ে নিয়ে যান, সিগন্যাল ওড়াবেন না”
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গাড়ি থামিয়েই কর্তব্যরত ওই ট্রাফিক ডিসি-কে সোজা নিজের কাছে ডেকে পাঠান মুখ্যমন্ত্রী। পুলিশের ওই উচ্চপদস্থ আধিকারিককে সামনে পেয়ে অত্যন্ত শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় নিজের আপত্তির কথা জানিয়ে শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট নির্দেশ দেন:
“আপনি এর পর থেকে আমি যখনই এই রাস্তা দিয়ে যাব, ট্রাফিক আইন ভাঙবেন না। এটা একদম ঠিক নয়। আমি সেরকম মুখ্যমন্ত্রী নই। দরকার পড়লে প্রোটোকল মেনে আমাকে ঘুরিয়ে অন্য রাস্তা দিয়ে ঢোকাবেন। কিন্তু আইন ভেঙে, ট্রাফিক সিগন্যাল উড়িয়ে আমাকে পার করাবেন না।”
খোদ রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের মুখে ট্রাফিক আইন মানার এমন কড়া নির্দেশ শুনে কার্যত বিস্মিত হয়ে যান ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ কর্মীরা। কারণ, বিগত কয়েক দশকে রাজ্যের প্রশাসনিক স্তরে এমন নজিরবিহীন সৌজন্যের ছবি খুব একটা দেখা যায়নি।
ভিআইপি সংস্কৃতির অবসান, আমলাতন্ত্রে কড়া বার্তা
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মঙ্গলবার ছিল নতুন সরকারের নবম দিন। আর এই সামান্য কয়েকদিনের মধ্যেই বিগত জমানার চেনা খোলনলচে বদলে ফেলতে চাইছেন শুভেন্দু অধিকারী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ভিআইপি কনভয়ের জন্য সাধারণ মানুষকে, নিত্যযাত্রীদের, এমনকি অ্যাম্বুল্যান্সকেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। সাধারণ মানুষের মনে পুঞ্জীভূত হওয়া এই দীর্ঘদিনের ক্ষোভের জায়গাতেই সরাসরি প্রলেপ দিতে চাইলেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী।
এর মাত্র কয়েকদিন আগেই পুলিশের ব্যবহৃত গাড়িগুলির বেহাল দশা এবং ‘ফিটনেস’ নিয়ে প্রকাশ্যে উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি পুলিশকে কড়া ভাষায় মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে, সাধারণ মানুষকে রাস্তায় আটকে আইন শেখানোর আগে পুলিশকে নিজেদের ভুলত্রুটি শোধরানো দরকার। মঙ্গলবারের রেড রোডের ঘটনাটি স্রেফ ট্রাফিক নিয়ম মানার বিষয় নয়, বরং রাজ্যের সমগ্র প্রশাসনিক কাঠামো এবং আমলাতন্ত্রের কাছে একটি কড়া বার্তা। রাজ্যের প্রধান নিজে নিয়ম মানলে, মন্ত্রী থেকে শুরু করে আমলাদেরও যে সেই পথেই হাঁটতে হবে, তা এদিন সুকৌশলে স্পষ্ট করে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী।