আমেরিকার পেট্রোল পাম্পগুলোতে হ্যাকারদের থাবা! নেপথ্যে কি তবে ইরান? কোন বড় বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে বিশ্বশক্তি?

আন্তর্জাতিক যুদ্ধক্ষেত্রের উত্তেজনা এবার আছড়ে পড়ল সাইবার দুনিয়ায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক রাজ্যের পেট্রোল পাম্পের জ্বালানি বা ফুয়েল ট্যাঙ্ক সিস্টেমে বড়সড় সাইবার হামলার ঘটনা সামনে এসেছে। আর এই ভয়ঙ্কর হ্যাকিংয়ের নেপথ্যে অন্য কেউ নয়, সরাসরি ইরানের মদতপুষ্ট হ্যাকারদের হাত রয়েছে বলে জোরালো সন্দেহ করছেন মার্কিন গোয়েন্দারা। আমেরিকার মতো মহাশক্তিধরের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোয় এই অনুপ্রবেশের ঘটনা বিশ্বজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি করেছে।
সামান্য পাসওয়ার্ডের ভুলে চরম সর্বনাশ!
তদন্তকারী সূত্রের খবর, হ্যাকাররা মূলত পেট্রোল পাম্পের জ্বালানির স্তর পরিমাপ করার বিশেষ প্রযুক্তি ‘অটোমেটিক ট্যাঙ্ক গেজ’ (ATG)-কে নিশানা করেছিল। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহু পেট্রোল পাম্পের এই এটিজি সিস্টেমগুলো সরাসরি ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত থাকলেও সেগুলোতে কোনো পাসওয়ার্ড সুরক্ষাই ছিল না!
নিরাপত্তার এই মারাত্মক গাফিলতি বা দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই হ্যাকাররা সহজে সিস্টেমে ঢুকে পড়ে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, হ্যাকাররা কিছু জায়গায় ট্যাঙ্কের স্ক্রিনে প্রদর্শিত ডেটা বা তথ্য বদলে দিতে সক্ষম হলেও, সৌভাগ্যবশত ট্যাঙ্কে থাকা জ্বালানির আসল পরিমাণের কোনো ক্ষতি করতে পারেনি।
গ্যাস সিস্টেম হ্যাক হওয়া কতটা বিপজ্জনক?
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন (CNN)-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সাইবার হামলায় এখনও পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের বিস্ফোরণ বা দুর্ঘটনার খবর মেলেনি। তবে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে মোটেও হালকাভাবে নিচ্ছেন না। তাঁদের মতে, কোনো হ্যাকার যদি এই সিস্টেমের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যায়, তবে তারা গ্যাস লিক বা ফুয়েল লাইনের কোনো বড় ত্রুটি অনায়াসে লুকিয়ে রাখতে পারবে। এর ফলে যে কোনো মুহূর্তে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড বা বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।
অতীতের ট্র্যাক রেকর্ড ঘেঁটে মার্কিন সংস্থাগুলোর তির ইরানের দিকেই। কারণ এর আগেও ইরানপন্থী সাইবার গোষ্ঠীগুলো তেল, গ্যাস এবং জল সরবরাহ ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তবে এই হামলার পেছনে চূড়ান্তভাবে ইরান সরকারই রয়েছে কিনা, তা একশো শতাংশ নিশ্চিত করতে আরও তদন্ত চালাচ্ছে মার্কিন প্রশাসন।
ক্ষেপণাস্ত্র নয়, সাইবার হামলাই এখন ইরানের প্রধান অস্ত্র
এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত চরম সীমায় পৌঁছেছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান সরাসরি আমেরিকার মাটিতে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা চালানোর ক্ষমতা রাখে না, তাই ‘সাইবার অ্যাটাক’-কে তারা প্রধান যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
এই ঘটনা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এমনিতেই এই যুদ্ধের জেরে আমেরিকায় পেট্রোল ও জ্বালানির দাম আকাশছোঁয়া। সিএনএন-এর একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৭৫% আমেরিকান মনে করেন এই ইরান যুদ্ধ সরাসরি তাঁদের পকেটে টান ফেলেছে এবং আর্থিক ক্ষতি করছে।
বছরের পর বছর ধরে ছক কষছে ইরান?
এটিজি সিস্টেমের এই দুর্বলতা নিয়ে সাইবার বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বহু বছর ধরেই সতর্ক করে আসছিলেন। ২০১৫ সালে নিরাপত্তা সংস্থা ‘ট্রেন্ড মাইক্রো’ পরীক্ষার জন্য অনলাইনে কিছু নকল এটিজি সিস্টেম তৈরি করেছিল, ইরানপন্থী হ্যাকাররা সেখানেও হানা দিয়েছিল। এমনকি ২০২১ সালে ‘স্কাই নিউজ’-এর একটি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছিল যে, ইরানের ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (IRGC) আমেরিকার গ্যাস স্টেশনগুলোকে সাইবার হামলার জন্য রেডি করে রেখেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বর্তমান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আমেরিকার তেল, গ্যাস, জল এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রে ঘন ঘন হামলা চালাচ্ছে ইরানি হ্যাকাররা। তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হয়ে উঠেছে, যা মার্কিন সাইবার ডিফেন্সের জন্য আগামী দিনে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।