‘বেড নেই’ বলে রোগী ফেরালেই কড়া অ্যাকশন! দায়িত্ব নিয়েই সরকারি হাসপাতালগুলিকে চরম হুঁশিয়ারি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর

বাংলায় ক্ষমতার পালাবদলের পর এবার রাজ্যের ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আমূল ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া শুরু করল নতুন সরকার। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি হাসপাতালগুলিতে সাধারণ মানুষের ‘বেড না পাওয়া’, এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে রোগী নিয়ে চাতক পাখির মতো ঘুরে বেড়ানো এবং শেষ পর্যন্ত চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর মতো একাধিক মর্মান্তিক অভিযোগে সরব হয়েছে আমজনতা। এবার সেই চেনা ও যন্ত্রণাদায়ক ছবিটা চিরতরে বদলে দিতে অত্যন্ত কড়া অবস্থান নিলেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। স্বাস্থ্য দপ্তরের শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করে মুখ্যমন্ত্রীর সাফ কথা— কোনও অবস্থাতেই রোগীকে হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না।

প্রথম বৈঠক থেকেই কড়া দাওয়াই মুখ্যমন্ত্রীর
গত শুক্রবার এসএসকেএম (SSKM) হাসপাতালে স্বাস্থ্য দপ্তরের শীর্ষকর্তা এবং কলকাতার ১২টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ও সুপারদের নিয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও হাই-প্রোফাইল বৈঠকে বসেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে এটাই ছিল তাঁর প্রথম উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা সভা। আর প্রথম বৈঠক থেকেই চিকিৎসাব্যবস্থাকে সচল করতে প্রশাসনকে স্পষ্ট ও কড়া নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

সরকারি হাসপাতালে বেড না পেয়ে রোগীর পরিবারের অসহায়তার ছবি বাংলায় নতুন নয়। বহু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, রেফার করার পর এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই অ্যাম্বুল্যান্সের ভেতরে রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এই ‘রেফার-সংস্কৃতি’ বন্ধ করতেই বৈঠকে কড়া বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, হাসপাতালে ন্যূনতম বেড খালি থাকলেও, রোগীর শারীরিক অবস্থা বিচার করে তাঁকে অবিলম্বে ভর্তি নিতে হবে।

বন্ধ হচ্ছে ‘ফোনে বেড বুকিং’ ও রাজনৈতিক প্রভাব
শুধুমাত্র পরিকাঠামোগত মারাত্মক সীমাবদ্ধতার কারণে যদি কোনও রোগীকে অন্য কোথাও রেফার করতেই হয়, তবে তার আগে চিকিৎসকদের নিশ্চিত করতে হবে যে অন্য হাসপাতালে বেড খালি রয়েছে কি না। রোগী ও তাঁর পরিবারের ওপর কোনও ধরনের অনিশ্চয়তার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া যাবে না বলেও নির্দেশ দেন তিনি।

শুধু তাই নয়, হাসপাতালের বেড দখল নিয়ে দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট রাজ নিয়েও সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, উপরমহলের ফোন বা কোনও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে হাসপাতালে বেড সংরক্ষণ বা বুকিং করার সংস্কৃতি আর বরদাস্ত করা হবে না। যার চিকিৎসার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, অগ্রাধিকার পাবেন কেবল তিনিই। মুখ্যমন্ত্রীর এই কড়া নির্দেশের পর স্বাস্থ্যসচিব-সহ উপস্থিত আধিকারিকরা আশ্বাস দেন, ভবিষ্যতে রোগী ভর্তির ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছ ও ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

দীর্ঘদিনের দাবি ও নতুন আশা
উল্লেখ্য, রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলিতে কত বেড খালি রয়েছে, তা সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে লাইভ প্রকাশ করার নির্দেশ আগেই দিয়েছিল কলকাতা হাইকোর্ট। একইসঙ্গে আরজি কর কাণ্ডের পর থেকে জুনিয়র ডাক্তারদের পক্ষ থেকেও দীর্ঘদিন ধরে একটি কেন্দ্রীয় রেফারেল ব্যবস্থার (Central Referral System) দাবি উঠছিল। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর এই সময়োপযোগী উদ্যোগকে স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক পদক্ষেপ বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ জমেছে। বিশেষ করে জেলার দরিদ্র মানুষ ও শহরের নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলি চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতালের ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর এই সক্রিয় উদ্যোগ যদি বাস্তবে একশো শতাংশ কার্যকর হয়, তবে সবচেয়ে বেশি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন তাঁরাই। রেফার-সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে সরকারি হাসপাতাল যদি সত্যিই রোগীর ভরসার জায়গা হয়ে উঠতে পারে, তবে তা বর্তমান ডাবল ইঞ্জিন সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবেই ধরা হবে।