২০১১-র পর পাওয়া কাস্ট সার্টিফিকেট কি তবে বাতিল? নতুন সরকারের এক চিঠিতেই ঘুম উড়ল লাখ লাখ মানুষের!

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলের পর এবার পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলের অন্যতম বড় দুর্নীতিতে হাত দিল রাজ্যের নতুন প্রশাসন। ২০১১ সাল থেকে রাজ্যে জারি হওয়া সমস্ত জাতিগত শংসাপত্র বা কাস্ট সার্টিফিকেট (SC, ST এবং OBC) এবার পুনর্যাচাই বা রি-ভেরিফিকেশন করার সিদ্ধান্ত নিল রাজ্য সরকার। শুক্রবার এই মর্মে রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দফতরের তরফে সমস্ত জেলাশাসককে (DM) অত্যন্ত কড়া নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে। এর ফলে বিগত ১৫ বছরে যারা কাস্ট সার্টিফিকেট পেয়েছেন, তাদের সকলের ভাগ্যই এখন বড়সড় প্রশ্নের মুখে।
কেন এই আকস্মিক পদক্ষেপ?
তৃণমূলের দীর্ঘ শাসনকালে SC, ST এবং OBC শংসাপত্র বিলিবণ্টনে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। ভুরি ভুরি ভুয়ো সার্টিফিকেট দিয়ে অযোগ্যদের সরকারি চাকরি বা উচ্চশিক্ষায় সুযোগ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সরব ছিল বর্তমান শাসকদল। এবার সেইসব ভুয়ো শংসাপত্র চিহ্নিত করে তা চিরতরে বাতিল করার লক্ষ্য নিয়েই ময়দানে নেমেছে প্রশাসন।
এই বিষয়ে রাজ্যের আদিবাসী উন্নয়ন এবং অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দফতরের মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু অত্যন্ত কড়া ও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “তৃণমূলের আমলে বহু ভুয়ো ও গরমিল থাকা এসসি-এসটি-ওবিসি সার্টিফিকেট তৈরি হয়েছে। এই সব জাল শংসাপত্র ব্যবহার করে অনেকে অনৈতিকভাবে সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন।” মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর পরিষ্কার যে, অযোগ্যদের হাত থেকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা কেড়ে নিয়ে প্রকৃত যোগ্যদের ফিরিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর নতুন সরকার।
খাঁড়া ঝুলছে দুর্নীতিবাজ সরকারি অফিসারদের ঘাড়েও!
এই মেগা অভিযানে শুধু যে সাধারণ মানুষের সার্টিফিকেট যাচাই করা হবে তা নয়, যে সমস্ত সরকারি আধিকারিকদের হাত দিয়ে এই ভুয়ো বা নিয়ম-বহির্ভূত শংসাপত্রগুলি জারি করা হয়েছিল, তাঁদের বিরুদ্ধেও কড়া আইনি ব্যবস্থার পথে হাঁটছে নবান্ন।
মন্ত্রী জানিয়েছেন, যে সব আধিকারিকদের তত্ত্বাবধানে এবং স্বাক্ষরে এই ত্রুটিপূর্ণ বা ভুয়ো সার্টিফিকেটগুলি ইস্যু করা হয়েছে, প্রশাসনিক তদন্তে তা প্রমাণিত হলে সেই আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি পদক্ষেপ করা হবে। এই পুরো প্রক্রিয়ার প্রথম প্রশাসনিক ধাপ হিসেবেই শুক্রবার রাজ্যের সমস্ত জেলাশাসকদের চিঠি দিয়ে অবিলম্বে এলাকাভিত্তিক রি-ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া শুরু করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুরোনো সেই আইনি বিতর্ক ও হাইকোর্টের রায়
জাতিগত শংসাপত্র নিয়ে বাংলায় এই জটিলতা বা আইনি লড়াই অবশ্য আজকের নয়। এর আগে কলকাতা হাইকোর্টেও এই ইস্যুতে ব্যাপক ভর্ৎসনার মুখে পড়তে হয়েছিল তৎকালীন রাজ্য সরকারকে। উল্লেখ্য, গত ২০২৪ সালের ২২ মে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি রাজাশেখর মান্থার ডিভিশন বেঞ্চ এক ঐতিহাসিক রায়ে ২০১০ সালের পর থেকে ইস্যু হওয়া রাজ্যের সমস্ত ওবিসি (OBC) শংসাপত্র একলহমায় বাতিল করে দিয়েছিল।
আদালত সেই সময় স্পষ্ট জানিয়েছিল, ওয়েস্ট বেঙ্গল ব্যাকওয়ার্ড ক্লাস কমিশনের ১৯৯৩ সালের আইন বা নির্দিষ্ট নিয়মকানুন মেনে ওই বিপুল সংখ্যক শংসাপত্রগুলি দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে তৎকালীন সরকার তড়িঘড়ি নতুন তালিকা তৈরি করলেও, সেখানেও বিস্তর গরমিলের অভিযোগে ২০২৫ সালের ১৫ জুন কলকাতা হাইকোর্ট সেই নতুন তালিকার ওপরেও স্থগিতাদেশ জারি করে দেয়।
সেই দীর্ঘ আইনি জটিলতা এবং পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগের আবহেই, এবার ২০১১ সাল থেকে দেওয়া সমস্ত ধরনের কাস্ট সার্টিফিকেটের এই সরকারি রি-ভেরিফিকেশনের সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং নজিরবিহীন বলে মনে করছে রাজ্যের political ও ওয়াকিবহাল মহল।