“চার দশকের আনুগত্যের পুরস্কার পেলাম!” পদ খোয়াতেই চরম অভিমানী কাকলি, তৃণমূলের অন্দরে মহাবিস্ফোরণ?

বিধানসভা ভোটে ভরাডুবির রেশ কাটতে না কাটতেই এবার রাজ্য রাজনীতিতে চরম নাটকীয় মোড়। তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকে নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছায়াসঙ্গী তথা বারাসতের চারবারের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের একটি সোশাল মিডিয়া পোস্টকে ঘিরে তোলপাড় শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। লোকসভায় দলের মুখ্য সচেতক (চিফ হুইপ) পদ থেকে অপসারিত হওয়ার ঠিক পরের দিনই সমাজমাধ্যমে বিস্ফোরক ও অত্যন্ত অভিমানী পোস্ট করলেন এই প্রবীণ রাজনীতিক।
শুক্রবার সকালে সোশাল মিডিয়ায় কাকলি ঘোষ দস্তিদার লেখেন, ‘‘৭৬ থেকে পরিচয়, ৮৪ থেকে পথচলা শুরু। চার দশকের আনুগত্যের জন্য আজ পুরস্কার পেলাম।’’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই লাইনের ছত্রে ছত্রে লুকিয়ে রয়েছে চরম হতাশা, অভিমান এবং ক্ষোভ। দলনেত্রীর সঙ্গে দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দিয়ে কাকলি কার্যত বুঝিয়ে দিলেন, এই ‘পুরস্কার’ তিনি আশা করেননি।
কালীঘাটের বৈঠক এবং পদের হাতবদল ঘটনার সূত্রপাত বৃহস্পতিবার। লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে কালীঘাটের বাসভবনে দলীয় সাংসদদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ডাকেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সূত্রের খবর, সেই বৈঠকেই লোকসভায় দলের ‘চিফ হুইপ’ পদ থেকে কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাঁর জায়গায় পুনরায় ফিরিয়ে আনা হয় শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। উল্লেখ্য, গত বছর মহুয়া মৈত্রের সঙ্গে এক বিতর্কের জেরে কল্যাণকে সরিয়ে কাকলিকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এক বছরের মাথায় পাশা উল্টে গেল।
নেত্রীর সঙ্গে ৪ দশকের পথচলা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন যোগমায়া কলেজে ছাত্র পরিষদের নেত্রী, তখন কাকলি ঘোষ দস্তিদার কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র রাজনীতির পরিচিত মুখ। ১৯৭৬ সালে তাঁদের প্রথম আলাপ। এরপর ১৯৮৪ সালের ঐতিহাসিক যাদবপুর লোকসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন সিপিএমের হেভিওয়েট নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়ে ‘জায়েন্ট কিলার’ হয়ে উঠছেন, তখন থেকেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই শুরু এই দুই নেত্রীর। ২০০৯ সালে বারাসত থেকে প্রথমবার সাংসদ হওয়ার পর টানা চারবার ওই কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছেন কাকলি।
ভরাডুবির কোপ নাকি অন্তর্দ্বন্দ্ব? রাজনৈতিক মহলের ধারণা, সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে তৃণমূলের নজিরবিহীন ভরাডুবির জেরেই এই রদবদল। বারাসত লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত হাবড়া, অশোকনগর, আমডাঙা, রাজারহাট-গোপালপুর এবং বারাসত সদরে ঘাসফুল শিবিরের প্রার্থীরা শোচনীয়ভাবে হেরেছেন। কেবল মধ্যমগ্রাম ও দেগঙ্গায় কোনোমতে জয় এসেছে। এই বিপর্যয়ের পর দলের অন্দরে যখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে, তখনই এই কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
এদিকে এই স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে তৃণমূলের অন্দরে চরম অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। দলের কোনো নেতাই এই বিষয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজী হননি। কাকলির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী তথা বারাসত পুরসভার পুরপ্রধান সুনীল মুখোপাধ্যায়ের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘‘সাংসদ সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেছেন। আমি তা নিয়ে কোনও মন্তব্য করব না।’’