ভোটের পরেই কি আমজনতার ঘাড়ে কোপ? চার মহানগরে জ্বালানির দামে বড় লাফ, ক্ষোভে ফুঁসছে বিরোধী শিবির

সাধারণ মানুষের পকেটে আবার বড়সড় কোপ বসতে চলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার জেরে দেশজুড়ে একধাক্কায় বেশ খানিকটা বাড়ল পেট্রল ও ডিজেলের দাম। আর জ্বালানির দাম বাড়ার স্বাভাবিক প্রভাব পড়তে চলেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রেও। রাজ্য পরিবহণ সংগঠনগুলির দাবি, জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে পণ্য পরিবহণের সামগ্রিক খরচ প্রায় ৩ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে।

তবে পরিবহণ খরচ বাড়লেও ব্যবসায়ীরা যাতে সাধারণ মানুষের ওপর অন্যায়ভাবে বাড়তি দামের বোঝা চাপিয়ে না দেন, তার জন্য সরকারের কাছে কড়া নজরদারির আর্জি জানিয়েছে সংগঠনগুলি।

কলকাতায় জ্বালানির দাম বাড়ল সবচেয়ে বেশি
দেশের চারটি প্রধান মহানগরের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতাতেই জ্বালানির দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। কলকাতায় পেট্রলের দাম লিটার প্রতি ৩.২৯ টাকা বেড়ে হয়েছে ১০৮.৭৪ টাকা এবং ডিজেল ৩.১১ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি লিটার ৯৫.১৩ টাকায়।

অন্যান্য মেট্রো শহরগুলির তুলনায় কলকাতার এই বৃদ্ধি বেশ চোখে পড়ার মতো। রাজধানীতে (দিল্লি) পেট্রল ও ডিজেলের নতুন দাম যথাক্রমে ৯৭.৭৭ টাকা এবং ৯০.৬৭ টাকা। মুম্বইতে পেট্রল বিকোচ্ছে ১০৬.৬৮ টাকায় এবং ডিজেল ৯৩.১৪ টাকায়। চেন্নাইতে লিটার প্রতি পেট্রলের দাম হয়েছে ১০৩.৬৭ টাকা এবং ডিজেল ৯৫.২৫ টাকা। মূলত রাজ্যভেদে ‘ভ্যাট’-এর (VAT) হার আলাদা হওয়ার কারণেই এই দামের তারতম্য ঘটে।

ট্রাক ও অ্যাপ ক্যাব চালকদের উদ্বেগ, ভ্যাট কমানোর দাবি
‘অল ইন্ডিয়া ট্রান্সপোর্টার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’-এর যুগ্ম সম্পাদক সুনীল আগরওয়াল জানান, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এই মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাশিতই ছিল। এর ফলে পরিবহণ খরচে ৩ শতাংশের মতো প্রভাব পড়লেও সামগ্রিকভাবে তা খুব বেশি নয়। তবে তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, জ্বালানির অজুহাত দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা যেন জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিক হারে না বাড়ান, সরকারকে তা নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে ট্রাক চালক ও মালিকদের ওপর থেকে আর্থিক চাপ কমাতে রাজ্য সরকারগুলিকে ভ্যাট বা স্থানীয় কর কিছুটা কমানোর অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

একই সুর শোনা গেছে অ্যাপ ক্যাব সংগঠনগুলির গলাতেও। ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল অনলাইন অ্যাপ ক্যাব গিল্ড’-এর সাধারণ সম্পাদক ইন্দ্রনীল বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে ক্যাব অপারেটরদের প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ৬০ টাকা অতিরিক্ত লোকসান বা খরচের মুখে পড়তে হবে। রাজ্য সরকার যদি করের ক্ষেত্রে কোনও ছাড় দেয়, তবেই এই ধাক্কা সামলানো সম্ভব।

শুরু রাজনৈতিক তরজা
জ্বালানির এই দাম বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তুমুল কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি। কেন্দ্রীয় সরকারের তীব্র সমালোচনা করে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে লিখেছেন, বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্র সরকার প্রথমে মানুষের ভোট লুঠ করেছে, আর এখন সাধারণ মানুষের পকেটে আঘাত হানছে। পাল্টা জবাবে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছেন, কেন্দ্রকে দোষ না দিয়ে রাজ্য সরকার নিজে কেন জ্বালানির ওপর থেকে ভ্যাট কমিয়ে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিচ্ছে না?

কেন হঠাৎ এই দাম বৃদ্ধি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিম এশিয়ায় সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাত ও উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম যেভাবে বেড়েছে, সেই তুলনায় ভারতে এখন যে দাম বাড়ানো হয়েছে তা সমুদ্রের মধ্যে একবিন্দু জল মাত্র। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় এই বৃদ্ধি মাত্র এক-দশমাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি উৎপাদন খরচ বিপুল বাড়া সত্ত্বেও টানা ১১ সপ্তাহ ধরে তেলের দাম বাড়ায়নি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি আর নিয়ন্ত্রণে না থাকায় লোকসান সামাল দিতে যৎসামান্য দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে তারা। তবে এই সামান্য বৃদ্ধির ধাক্কাতেই সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ চওড়া হচ্ছে।