জঙ্গলমহলে কেন ধুয়েমুছে সাফ তৃণমূল? নেপথ্যে কি শুধু আইপ্যাক নাকি শুভেন্দু ম্যাজিক?

লোকসভা নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই রাজনৈতিক মহলে এখন সবচেয়ে বড় চর্চার কেন্দ্রবিন্দু—জঙ্গলমহল। ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া থেকে পুরুলিয়া, একসময়ের শক্ত ঘাঁটি আজ রাজ্যের শাসক দলের কাছে মরুভূমি। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে কীভাবে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল তৃণমূলের সংগঠন? কেনই বা দুই সাংসদ পাওয়ার পরেও বিধানসভার নিরিখে এই ভরাডুবি? এই হারের ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে উঠে আসছে বিস্ফোরক সব তথ্য।

আইপ্যাক ও ‘অযোগ্য’ নেতৃত্বের দাপট
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জঙ্গলমহলের এই বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হলো জনবিচ্ছিন্ন নেতাদের হাতে রাশ তুলে দেওয়া। অভিযোগ উঠেছে, এলাকার মানুষের সঙ্গে যাদের নূন্যতম নাড়ির টান নেই, তাদেরই বড় বড় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে ভোটকুশলী সংস্থা ‘আইপ্যাক’-এর ভূমিকা নিয়ে দলের অন্দরেই ক্ষোভের আগুন জ্বলছে।

অভিযোগ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি মানুষের যে আবেগ ও শ্রদ্ধা ছিল, তা আইপ্যাকের অতিরিক্ত খবরদারিতে ফিকে হয়ে গিয়েছে। আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় পুরোনো লড়াকু কর্মীদের সরিয়ে অযোগ্যদের হাতে সংগঠনের ক্ষমতা দেওয়া এবং নিচুতলার কর্মীদের সঙ্গে অশালীন ব্যবহার মানুষের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।

‘চুরির লাইসেন্স’ ও প্রশাসনের একাংশ
জঙ্গলমহলের শান্তিপ্রিয় মানুষ শাসক দলের একাংশের উদ্ধত আচরণ ভালো চোখে দেখেননি। স্থানীয় স্তরে ‘পয়সা দাও আর চুরির লাইসেন্স নাও’—এই নীতি প্রশাসন থেকে দলের নিচুতলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল বলে দাবি বিশেষজ্ঞদের। সাধারণ মানুষকে ‘টেকেন ফর গ্রান্টেড’ মনে করা এবং লুম্পেন রাজের মাধ্যমে এলাকা শাসন করতে চাওয়ার ফল হাতেনাতে পেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস।

শুভেন্দু অধিকারীর ‘ঘরের ছেলে’ ইমেজ
২০০৮ সাল থেকে জঙ্গলমহলের প্রতিটি ব্লক ও গ্রাম ছিল শুভেন্দু অধিকারীর নখদর্পণে। একসময় তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে তিনিই জঙ্গলমহল হাসিল করেছিলেন। আজ তিনি বিরোধী দলনেতা হলেও নিজের সেই ‘ঘরের ছেলে’ ইমেজ ধরে রাখতে সফল হয়েছেন। শুভেন্দুর নিরলস যাতায়াত এবং মানুষের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগই বিজেপির এই বিপুল সাফল্যের পথ প্রশস্ত করেছে।

আরএসএস-এর নিঃশব্দ ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’
তৃণমূল যখন গোষ্ঠীকন্দলে ব্যস্ত, তখন নিঃশব্দে কাজ সেরেছে বনবাসী কল্যাণ আশ্রম, একল বিদ্যালয় এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। ২০২৫-এর শতবর্ষকে লক্ষ্য রেখে জঙ্গলমহলের প্রতিটি গ্রামে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জাল বুনেছিল আরএসএস সহযোগীরা। ‘আদিবাসীদের পাশে আছি’ এই বার্তাকে তারা মানুষের ড্রয়িংরুম পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল। মানুষের ক্ষোভের আগুনকে কাজে লাগিয়ে আরএসএস যে নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটিয়েছে, তার আঁচ পায়নি শাসক শিবিরের গোয়েন্দা বিভাগও।

পরিণতি যা হওয়ার তাই হয়েছে। তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে ঘাসফুল শিবিরের জঙ্গলমহল দুর্গ। ‘আদিবাসী দরদি’ ভাবমূর্তি নিয়ে ময়দানে নামলেও শেষরক্ষা হয়নি তৃণমূলের।