“৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যাওয়াই কি কাল হলো?”-১৯০ আসনে এগিয়ে গেরুয়া ঝড়, ধূলিসাৎ তৃণমূলের দুর্গ!

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব মাহেন্দ্রক্ষণ। দীর্ঘ ১৫ বছরের ঘাসফুল শাসনের অবসান ঘটিয়ে নবান্নের দখল নেওয়ার পথে ভারতীয় জনতা পার্টি। দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটের ট্রেন্ড অনুযায়ী, ১৯০টি আসনে এগিয়ে থেকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে দৌড়াচ্ছে বিজেপি। অন্যদিকে, মাত্র ৯৯টি আসনে আটকে গিয়েছে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। ফলাফল বলছে, ‘অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ’ জয়ের যে লক্ষ্য নিয়ে অমিত শাহ-জেপি নাড্ডারা ঝাঁপিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়িত হওয়ার পথে।
কেন এই ভরাডুবি? হারের ময়নাতদন্তে উঠে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য:
১. হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণ ও ভোটব্যাঙ্ক: এবারের নির্বাচনে হিন্দু-মুসলিম ফ্যাক্টর সবথেকে বড় ভূমিকা পালন করেছে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী সকালেই দাবি করেছিলেন, ‘হিন্দু ইভিএম বিজেপির, আর মুসলিম ইভিএম তৃণমূলের।’ বর্তমান ট্রেন্ড বলছে, হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক একতরফাভাবে পদ্মশিবিরে যাওয়ায় বড় লিড পেয়েছে বিজেপি।
২. অকেজো তৃণমূলের ‘ভোট মেশিনারি’: বিরোধী মহলে বারবার অভিযোগ উঠত যে, পেশিবল আর রিগিং-এর জোরেই তৃণমূল জেতে। এবার নির্বাচন কমিশন সেই রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছিল। রেকর্ড সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন এবং পুলিশের অতি-সক্রিয়তার ফলে তৃণমূলের চিরাচরিত ‘ভোট মেশিনারি’ এবার ঘরবন্দি হয়ে পড়েছিল। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যালট বাক্সে।
৩. মাস্টারস্ট্রোক ‘SIR’ ফ্যাক্টর: ভোটার তালিকা সংশোধন বা SIR নিয়ে গোড়া থেকেই সরব ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ পড়া নিয়ে মামলা গড়িয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। বিজেপি দাবি করেছিল, রোহিঙ্গা ও অনুপ্রবেশকারীদের হটাতেই এই পদক্ষেপ। আজকের ফলাফল বলছে, এই বিশাল সংখ্যক ভোটার বাদ যাওয়া তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে বড়সড় ধস নামিয়েছে।
৪. অন্তর্ঘাত ও নিচুতলার ক্ষোভ: তৃণমূলের অন্দরের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবার প্রকট হয়ে ধরা দিয়েছে। পুরনো কর্মীদের বসিয়ে দিয়ে ভিন দল থেকে আসা নেতাদের গুরুত্ব দেওয়ায় দলের নিচুতলায় ব্যাপক অসন্তোষ ছিল। ক্ষুব্ধ কর্মীদের একাংশ এবার জোড়াফুলে ভোট না দিয়ে দলকে ‘শিক্ষা’ দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন বলেই মত রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের।
৫. ৯৩ শতাংশ ভোট ও প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া: বাংলার ইতিহাসে এবার রেকর্ড ৯৩ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, যখনই ভোটদানের হার অস্বাভাবিক বাড়ে, তখনই তা সরকার বিরোধী হাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনে সারদা, নারদা থেকে শুরু করে নিয়োগ দুর্নীতির পাহাড়প্রমাণ অভিযোগ এবং রাজ্যে কর্মসংস্থানের অভাব—সব মিলিয়ে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবার ইভিএমে আছড়ে পড়েছে।
সব মিলিয়ে, ২০১১ সালে যে পরিবর্তনের হাত ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় এসেছিলেন, ২০২৬-এ এসে সেই পরিবর্তনের হাওয়াই তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চলেছে। বাংলার মসনদে কি তবে এবার প্রথমবার বসতে চলেছে কোনো গেরুয়া নেতৃত্ব? উত্তরের অপেক্ষায় গোটা দেশ।