ম্যামথ যুগের দানব নয়, বরফে ঘুমিয়ে ছিল এই জীব! ২৪ হাজার বছর পর জেগে উঠতেই অবাক বিজ্ঞানীরা

সাইবেরিয়ার হাড়কাঁপানো বরফের নিচে যেন লুকিয়ে ছিল এক জীবন্ত টাইম মেশিন। যখন পৃথিবীতে ম্যামথরা দাপিয়ে বেড়াত, মানুষ সবে গুহায় ছবি আঁকতে শিখছে—সেই সময়ের এক ফোঁটা জল আটকে গিয়েছিল বরফের স্তরে। আর সেই জলের বিন্দুতে বন্দি ছিল এক অতিক্ষুদ্র জীব, যার নাম ‘ডেলয়েড রোটিফার’। খালি চোখে দেখা না গেলেও, ২৪ হাজার বছর পর সেই প্রাচীন প্রাণের স্পন্দন ফিরে এল ল্যাবরেটরিতে।
বরফ গলতেই ম্যাজিক: জেগে উঠে বাচ্চা দিল রোটিফার!
রাশিয়ার সয়েল ক্রায়োলজি ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীরা আলাজেয়া নদীর ধারে প্রায় ৩.৫ মিটার গভীর পারমাফ্রস্ট (চিরতুষার) খুঁড়ে সেই প্রাচীন বরফ সংগ্রহ করেন। কার্বন ডেটিং-এর রিপোর্টে চোখ কপালে ওঠে বিজ্ঞানীদের। বরফটির বয়স প্রায় ২৩,৯৬০ থেকে ২৪,৪৮৫ বছর।
পরীক্ষাগারে পেট্রি ডিশে সেই বরফ ধীরে ধীরে গলাতেই ঘটে অবিশ্বাস্য ঘটনা। কয়েক সপ্তাহ পর মাইক্রোস্কোপে দেখা যায়, হাজার হাজার বছর ধরে হিমায়িত সেই রোটিফারটি দিব্যি নড়াচড়া করছে, খাবার খাচ্ছে! শুধু তাই নয়, ‘পার্থেনোজেনেসিস’ পদ্ধতিতে সঙ্গী ছাড়াই সে একের পর এক বাচ্চা দিচ্ছে।
মৃত্যুকে জয় করার রহস্য: কী এই ‘ক্রিপ্টোবায়োসিস’?
বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, এই অবিশ্বাস্য জীবনীশক্তির রহস্য হলো ‘ক্রিপ্টোবায়োসিস’ বা ‘গুপ্ত জীবন’। প্রতিকূল পরিবেশ দেখলেই এই জীবরা শরীর থেকে জল বের করে দেয় এবং মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। ফলে কোষের ভেতর বরফের ক্রিস্টাল তৈরি হয়ে কোষ ফেটে যাওয়ার ভয় থাকে না। যেন শরীরের সুইচ এক নিমেষে ‘অফ’ করে দেওয়া! অনুকূল পরিবেশ ও খাবার পেলেই আবার ‘সুইচ অন’ হয়ে জেগে ওঠে এরা। এর আগে ১০ বছরের জন্য রোটিফার জাগানোর রেকর্ড থাকলেও, ২৪ হাজার বছর টিকে থাকা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক বিশ্বরেকর্ড।
এই আবিষ্কার কেন বদলে দিতে পারে পৃথিবী?
গবেষক স্ট্যাস মালাভিন এই ঘটনাকে চিকিৎসা ও মহাকাশ বিজ্ঞানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন:
অঙ্গ সংরক্ষণে বিপ্লব: বর্তমানে ট্রান্সপ্ল্যান্টের জন্য মানুষের হার্ট বা কিডনি মাত্র কয়েক ঘণ্টা সংরক্ষণ করা যায়। রোটিফারের এই পদ্ধতি আয়ত্ত করতে পারলে ভবিষ্যতে মানব অঙ্গ বছরের পর বছর বরফে জমিয়ে রাখা সম্ভব হবে।
মহাকাশ যাত্রা: মঙ্গল বা অন্য গ্রহে পৌঁছাতে শত শত বছর সময় লাগবে। মানুষকে কি কৃত্রিমভাবে ‘হাইবারনেশনে’ বা দীর্ঘ ঘুমে পাঠিয়ে পাঠানো সম্ভব? রোটিফার সেই গবেষণার নতুন দরজা খুলে দিল।
জলবায়ু পরিবর্তনের অশনিসংকেত: এই আবিষ্কার যতটা আনন্দের, ততটাই ভয়ের। সাইবেরিয়ার পারমাফ্রস্ট উষ্ণায়নের ফলে গলছে। বরফের নিচে শুধু এই নিরীহ জীব নয়, ঘুমিয়ে আছে ৩০ হাজার বছরের পুরনো মারণ ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও অ্যানথ্রাক্সের বীজ।
সতর্কবার্তা: ২০১৬ সালে সাইবেরিয়ায় ৭৫ বছর পর গলে যাওয়া একটি হরিণের মৃতদেহ থেকে অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, বরফ গললে প্রাচীন সব মহামারী আবার জেগে উঠে মানবসভ্যতাকে বিপদে ফেলতে পারে।
শেষ কথা: ২৪ হাজার বছরের ঘুম ভাঙিয়ে বিজ্ঞানীরা হয়তো অসাধ্য সাধন করেছেন, কিন্তু প্রকৃতি কি এর মাধ্যমে বড় কোনো বিপদের সংকেত দিচ্ছে? প্রাচীন এই ‘অমর’ জীবদের জেগে ওঠা আশীর্বাদ না অভিশাপ, উত্তর দেবে ভবিষ্যৎ।