কর্তব্য যখন পাহাড় সমান! নিজের স্ত্রীর মৃত্যু শংসাপত্র লিখতে গিয়ে কলম থামল ৯৮ বছরের বিশু ডাক্তারের

একজন চিকিৎসকের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় কোনটি? সম্ভবত সেটিই, যখন তাঁকে নিজের প্রিয়তম মানুষের নিথর দেহের সামনে দাঁড়িয়ে পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে হয়। বীরভূমের লাভপুরের প্রবীণ চিকিৎসক ৯৮ বছর বয়সী সুকুমার চন্দ্র ওরফে বিশু ডাক্তারবাবুর জীবনে নেমে এল তেমনই এক বিষাদঘন মুহূর্ত। হাজার হাজার মানুষের ডেথ সার্টিফিকেট লিখতে যাঁর হাত কোনোদিন কাঁপেনি, নিজের স্ত্রী রাধা দেবীর মৃত্যুর শংসাপত্র লিখতে গিয়ে আজ সেই হাতই রুদ্ধ হলো অভিমানে।

তারাশঙ্করের নির্দেশে জীবন উৎসর্গ বিশু ডাক্তারবাবুর ইতিহাস হার মানায় রূপকথাকেও। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করার পর উত্তরপ্রদেশের অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরি হাসপাতালে মোটা বেতনের চাকরির সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু কথা সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে ডেকে বলেছিলেন, “তুমি চলে গেলে লাভপুরের মানুষের বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু হবে।” সেই নির্দেশ শিরোধার্য করে লোভনীয় চাকরি ছেড়ে গ্রামে এক টাকায় চিকিৎসা শুরু করেছিলেন তিনি। আজও তাঁর কাছে চিকিৎসার কোনো নির্দিষ্ট ফি নেই, যা পান তাতেই খুশি।

কর্তব্যের কাছে ব্যক্তিগত শোকও তুচ্ছ জীবন তাঁকে বারবার কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। ২০২০ সালে সরকার তাঁকে জীবনকৃতি সম্মান দিলেও, ব্যক্তিগত জীবনে নেমে এসেছিল অন্ধকার। দু’বছর আগে নিজের চিকিৎসক পুত্র সৌমিত্র চন্দ্রকে হারিয়েছিলেন তিনি। তবুও শোকস্তব্ধ মনে ছেলের শ্রাদ্ধের দিনও রোগী দেখেছেন বিশু বাবু। তাঁর আদর্শ— মানুষের সেবা যেন কখনও থেমে না থাকে।

কেঁপে উঠল হাত দীর্ঘ ৪ মাস শয্যাশায়ী থাকার পর গত সপ্তাহে ৮৯ বছর বয়সে মারা যান তাঁর স্ত্রী রাধা দেবী। প্রখ্যাত নাট্যকর্মী উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায় বলেন, “স্ত্রীর মৃত্যুর শংসাপত্র লেখার সময় তাঁর কলম থমকে যাচ্ছিল।” সেই শোকাতুর মুহূর্তে বিশু ডাক্তারবাবু কেবল বলেন, “এই দিনটাও আমাকে দেখতে হবে, সেটা কোনোদিন ভাবিনি।”

৯৮ বছর বয়সেও লাভপুরের মানুষের জন্য তিনি এক জ্যান্ত ইতিহাস। বার্ধক্য থাবা বসালেও তাঁর কর্তব্যের কলম আজও সচল, শুধু মাঝে মাঝে প্রিয়জনদের বিদায়ে সেই কালিটুকু চোখের জলে ঝাপসা হয়ে যায়।

একনজরে বিশু ডাক্তারবাবুর জীবন
নাম: সুকুমার চন্দ্র (বিশু ডাক্তার)।

বয়স: ৯৮ বছর।

জন্মস্থান: লাভপুর, বীরভূম।

কৃতিত্ব: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে গ্রামসেবায় আত্মনিয়োগ।

সম্মান: ২০২০ সালে রাজ্য সরকারের জীবনকৃতি সম্মান।