জীবন-যন্ত্রণাকে ভুলিয়ে দিয়েছে ধর্মের মোহ, পরিযায়ী শ্রমিক ও কৃষকদের মুখে রেশনের চিন্তা নয়, ঘুরেফিরে মন্দির-মসজিদের রাজনীতি।

বহিষ্কৃত তৃণমূল নেতা হুমায়ুন কবীরের বেলডাঙাতে ‘বাবরি মসজিদ নির্মাণের’ ঘোষণার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির চালচিত্র সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই ধর্মীয় ইস্যুটি রাজনীতির গতিপথকে কোন দিকে চালিত করছে, তার খোঁজ নিতে সরেজমিনে মুর্শিদাবাদ ঘুরে দেখল ইটিভি ভারত।
মুর্শিদাবাদের বারোমাসিয়ার জীবনসংগ্রাম
মুর্শিদাবাদ জেলার জলঙ্গি বিধানসভার বারোমাসিয়া গ্রামের ছবিটা রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতির দৈন্যদশা তুলে ধরে। ভোরে খেজুর রস সংগ্রহ করে গুড় জ্বাল দেন সাকিরুল মণ্ডল, যার কেজিপ্রতি দাম মাত্র ২০০ টাকা। চাষবাস, দিনমজুরি ও পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করেই চলে এখানকার পাঁচ হাজার সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মানুষের সংসার।
আর্থিক অনটন, স্কুলের খরচ বৃদ্ধি এবং চাকরির অনিশ্চয়তার কারণে এ অঞ্চলে বাল্যবিবাহের সংখ্যা সর্বাধিক। ১০০ দিনের কাজ বন্ধ থাকায় গৌতম মণ্ডলদের মতো অনেকেই এখন কাজ হারিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তাঁদের জীবনে রেশনের চাল-ডালই একমাত্র ভরসা।
জীবন-যন্ত্রণাকে ছাপিয়ে ধর্মের মোহ
মুর্শিদাবাদের স্থানীয় মানুষজন দারিদ্র্য, রাস্তা, চিকিৎসা বা বিড়ি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির মতো জ্বলন্ত সমস্যা নিয়ে জনপ্রতিনিধিদের প্রশ্ন করছেন না। বরং তাঁরা এখন বেলডাঙার বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন বা কলকাতার ব্রিগেডের গীতাপাঠের মতো ঘটনা নিয়ে বেশি ওয়াকিবহাল।
রাজনীতির কারবারিরা মন্দির-মসজিদ নিয়ে সাকিরুল-গৌতমদের এমনভাবে মাতিয়ে রেখেছেন যে, তাঁরা নিজেদের জীবন-যন্ত্রণাকে পিছনে ঠেলে ধর্মীয় মোহে নিজেদের চায়ের দোকানও আলাদা করছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পংক্তি, “ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে/অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে”, যেন এখানে বাস্তবে প্রতিফলিত।
স্থানীয়দের অধিকাংশের প্রশ্ন, “দিদি (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) একটার পর একটা মন্দির করছেন। মসজিদ করলে অপরাধ কীসের? মসজিদ করা যদি হুমায়ুনের অপরাধ হয়, তাহলে আমরা হুমায়ুনকেই ভোট দেব।”
হুমায়ুন ফ্যাক্টর ও রাজনৈতিক কৌশল
জেলবন্দি শেখ শাহজাহান-সহ একাধিক রাজনৈতিক ডামাডোলের পর এই বাবরি ইস্যু রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মুর্শিদাবাদকে ঘিরে ছাব্বিশের নির্বাচনকে আবর্তিত করছে। উত্তর ২৪ পরগনা, ভাঙড়, বর্ধমান, নদিয়া থেকেও ট্রাক ভর্তি করে ইট-সিমেন্ট যাচ্ছে বেলডাঙায়। লক্ষ লক্ষ টাকা জমা হচ্ছে হুমায়ুন কবীরের অ্যাকাউন্টে।
তৃণমূলের চিন্তা: তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ মহল উদ্বিগ্ন যে ভরতপুর, বেলডাঙা, রানিনগর-সহ একাধিক এলাকা হুমায়ুনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মিম (AIMIM) বা এসডিপিআই (SDPI)-এর সঙ্গে হুমায়ুন জোট বাঁধলে সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক ধরে রাখা কঠিন হবে।
বিজেপির আশা: হুমায়ুনের বিদ্রোহী সত্তাকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি আশা করছে, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আবেগপ্রবণ মুসলিমদের ইট বয়ে নিয়ে যাওয়ার ছবি দেখিয়ে তারা হিন্দু ভোটব্যাংককে এককাট্টা করতে সুবিধা পাবে।
বিরোধীদের বার্তা: প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরী এবং সিপিএমের মহম্মদ সেলিম উভয়ই এই বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে সরব। অধীররঞ্জন বলছেন, “দিদি আর মোদির অদ্ভুত মিল, দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি করছে বিজেপি, সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলায় বিভাজনের রাজনীতি করছে তৃণমূল।” সেলিম এটিকে তৃণমূলের কৌশল হিসেবেই দেখছেন।
অসহায় দরিদ্র মানুষের জীবনধারণের প্রশ্নকে ছাপিয়ে মসজিদ নির্মাণ, গীতাপাঠ ও কোরান তেলাওয়াতের মতো বিষয়গুলিই আগামী দিনে বঙ্গ রাজনীতির নিউক্লিয়াস হয়ে ওঠে কি না, সেদিকেই নজর থাকবে।