মুম্বাইয়ের বর্ষার ভোগান্তি কি শুধু গুজব? ৪ বছর ধরে গর্তে মৃত্যু ‘০’! এনসিআরবি (NCRB) বনাম MoRTH: কেন মিলছে না মৃত্যুর সঠিক হিসাব?

বর্ষার মুম্বাই মানেই রাস্তার গর্ত বা ‘পোটহোল’ (Pothole)-এর আতঙ্ক। কিন্তু সরকারি তথ্যে উঠে আসা চিত্রটি চমকে দেওয়ার মতো। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রকের (MoRTH) ‘Road Accident in India’ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে মুম্বাইয়ে গর্ত-সংক্রান্ত কারণে একটিও মৃত্যু বা আঘাতের ঘটনা ঘটেনি!

মুম্বাই ছাড়াও মহারাষ্ট্রের অন্যান্য প্রধান শহর—নাগপুর, নাসিক এবং পুণেও—এই সময়ের মধ্যে গর্ত-সংক্রান্ত মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা ‘শূন্য’ দেখিয়েছে। পুণে তো ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে কোনো গর্ত-সংক্রান্ত দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর ঘটনাই রিপোর্ট করেনি।

হাইকোর্টের কড়া নির্দেশ ও ক্ষতিপূরণের রায়
এই আপাত ‘পরিষ্কার’ পরিসংখ্যানটি তখনই প্রাসঙ্গিকতা পায় যখন এই সপ্তাহে বম্বে হাইকোর্ট রাস্তার বেহাল দশা নিয়ে কড়া মন্তব্য করে। একাধিক পিটিশনের শুনানি শেষে আদালত সাফ জানায়, খারাপ রাস্তার জন্য ‘কোনো অজুহাত’ চলতে পারে না।

আদালতের নির্দেশ:

১. ৬ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ: রাস্তার গর্ত বা খোলা ম্যানহোলের কারণে কারও মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ৬ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ২. জবাবদিহিতা: আহতদের জন্যও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং নাগরিক সংস্থা ও ঠিকাদারদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ৩. দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা: ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য সংস্থাগুলির মধ্যে রয়েছে মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন, এমএমআরডিএ, এমএসআরডিসি, এনএইচএআই এবং পিডব্লিউডি।

আদালত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছে, প্রতি বছর প্রচুর অর্থ খরচ করেও গর্ত মেরামতি এক-দু’দিনের বৃষ্টিতেও টিকে থাকে না, যা জনগণের কষ্টের কারণ।

তথ্যের ফারাক নিয়ে প্রশ্ন
কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের তথ্য অনুসারে, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ভারতে গর্ত-সংক্রান্ত কারণে মোট ৯,১০৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে শুধু মহারাষ্ট্রেই মারা গেছেন ১৫৮ জন।

জাতীয় চিত্র: ২০২৩ সালে ভারতজুড়ে ৫,৮০০-এর বেশি দুর্ঘটনা এবং ২,১৬১টি মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে রাস্তার গর্তের কারণে।

অন্যান্য রাজ্যে উদ্বেগ: মহারাষ্ট্রের প্রধান শহরগুলি ‘শূন্য’ দেখালেও, রাজ্যটিতে ২০২৩ সালে ৬১টি দুর্ঘটনা এবং ২৯টি মৃত্যু রেকর্ড হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে রাজ্যের অন্যত্র গর্ত এখনও মারাত্মক উদ্বেগের কারণ।

তবে মুম্বাইয়ের ‘শূন্য’ পরিসংখ্যান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। একটি সাধারণ অনলাইন সার্চে দেখা যায়, ২০২১ সালে কুরলায় একজন ৩২ বছর বয়সী ব্যক্তি তাঁর স্ত্রী ও দুই বছরের কন্যা সহ বাইক নিয়ে গর্তে পড়ে গিয়ে মারা যান।

MoRTH-এর তথ্য রাজ্য পুলিশ বিভাগের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। মন্ত্রকের এক কর্মকর্তা News18-কে জানিয়েছেন, মুম্বাইয়ের ‘শূন্য’ পরিসংখ্যানের কারণ তথ্যের কম রিপোর্ট হওয়া হতে পারে। গর্তে মৃত্যু অনেক সময় ‘নিয়ন্ত্রণ হারানো’ বা ‘স্কিডিং’ হিসাবে রিপোর্ট করা হয়, কারণ দুর্ঘটনার সঠিক কারণ চিহ্নিত করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো মানদণ্ড নেই।

খোলা ম্যানহোল: আরেক মারাত্মক বিপদ
আদালত তার রায়ে গর্ত এবং খোলা ম্যানহোল—এই দুটিকেই বারবার ঘটতে থাকা নাগরিক ঝুঁকি হিসাবে উল্লেখ করেছে। গর্তে মৃত্যুর সংখ্যা অফিসিয়ালি ‘শূন্য’ দেখানো হলেও, ম্যানহোলে মৃত্যু মহারাষ্ট্রের রেকর্ডে বহাল আছে।

২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ভারতে খোলা ম্যানহোলে মোট ৭০৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মহারাষ্ট্রেই প্রাণ হারিয়েছেন ১০৬ জন। অর্থাৎ, সারা দেশে ম্যানহোলে মৃত্যুর প্রতি সাতটির মধ্যে প্রায় একটি মহারাষ্ট্রের।

সরকারি তথ্যে এই ‘পোটহোল ডেটা প্যারাডক্স’ স্পষ্ট করে দিল যে, রাস্তায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপেই বড়সড় গলদ রয়েছে। সঠিক তথ্যের স্বীকৃতি ছাড়া নাগরিক সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা কঠিন।